লকডাউন ডায়েরি – ১০ মে, ২০২০

১০.‌০৫.‌২০২০। রবিবার

সকাল ৮.‌১০

গত কয়েকদিন ধরে রাতে ঘুমোনর আগে খুব মহাভারত পড়তে ইচ্ছে করছে। ব্যাসদেবের নয়। রাজশেখর বসুর। অভীকবাবু পড়তে বলেছিলেন। তাঁর কথাতেই রাজশেখর বসুর লেখা রামায়ণ আর মহাভারত কিনেছিলাম। রামায়ণটা বেশ সহজ–সরল। বানরসেনাও বুঝতে পারবে। কিন্তু মহাভারতটা একেবারে অন্য লেভেলের। কতবার যে পড়েছি!‌ একটা সময় তো বেডসাইড টেবিলে রাখা থাকত। রোজ রাতে পড়তাম। যতবার পড়তাম, ততবার নতুন নতুন দিক খুলে যেত।

দুটো বই–ই হারিয়ে ফেলেছি। কী করে হারাল কে জানে!‌ অবশ্য জানলে তো আর হারাত না। নাকি হারায়নি?‌ নিজেই কোথাও খুব যত্ন করে তুলে রেখেছি?‌ সল্টলেকের বাড়ির বুককেসে খুঁজলাম। পেলাম না। চেতলার বাড়িতে তো বই রাখার জো প্রায় নেই। বাচ্চারা দাঁত ওঠার সময় বই, জুতো, অফিসের চামড়ার ব্যাগ ইত্যাদির উপর দাঁতের ধার পরীক্ষা করে। মাঝে মাঝে নখেরও। একবার ভুল করে ড্রয়িংরুমে অফিসের চামড়ার ব্যাগ ফেলে আসার পর সারারাত ধরে আঁচড়েছিল নুটু। তারপর থেকে ডবল সতর্ক হয়ে গিয়েছি।

কিন্তু তাহলে কি বইদুটো অফিসে কোথাও রেখেছি?‌ খুঁজতে হবে আবার ভাল করে। মহাভারতটা এখন দরকার ছিল। খুব মিস্‌ করছি। একবার কি অ্যামাজনে ট্রাই নিয়ে দেখব?‌ পরে কখনও পুরনোটা খুঁজে পাওয়া গেলে না–হয় দুটোই থাকবে। কিছু কিছু জিনিসের বাহুল্যে কোনও ক্ষতি হয় না। যেমন আন্দ্রে আগাসির অটোবায়োগ্রাফি ‘ওপেন’। আমার পড়া অদ্যাবধি শ্রেষ্ঠ আত্মজীবনী। যে কোনও পর্যায়ে। তিনটে কেনা আছে। যখনই সময় পাই, একটু করে পড়ি। ছোটবেলায় যেমন একটু একটু করে আইসক্রিম চাখতাম।

মহাভারত পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে, অর্জুন আর কর্ণের মধ্যে হরেদরে কোনও ফারাক নেই। দু’জনেই বীর। দু’জনেই অতুলনীয় যোদ্ধা। গ্রেট ওয়ারিয়র। দু’জনেরই অসীম গরিমা। দু’জনেই কৌন্তেয়। এবং দু’জনেই সমানভাবে দ্রৌপদীতে আসক্ত।

তাহলে অর্জুন কোথায় কর্ণকে মেরে বেরিয়ে গেলেন?‌ কোন ফ্যাক্টরে?

‌কৃষ্ণ!‌

কর্ণের কোনও কৃষ্ণ ছিল না। যে তাকে ঠিক সময়ে ঠিক দিকটা দেখাতে পারবে। বাস্তবের মতোই জীবনেও সারথি হবে। সঠিক পথে জীবনের রথ চালনা করতে পারবে। কৃষ্ণকে সখা হিসেবে না পেলে অর্জুন কর্ণের পাল্লা টানতে পারতেন কিনা, তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ জন্মেছে রাজশেখর বসু পড়তে পড়তেই। কৃষ্ণ না থাকলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের আগে অর্জুন তো গিল্টের চোটে গাণ্ডীব–টাণ্ডীব ফেলে রথের মেঝেতে পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসেছিলেন!‌ অতবড় বীর। ধনুর্ধরশ্রেষ্ঠ। তাঁরও কী রকম একটা ভেবলে যাওয়া অবস্থা হয়েছিল। তখন কৃষ্ণ না থাকলে তো কেলেঙ্কারি হতো!‌

অস্যার্থ— সফল হতে গেলে সব মহাযোদ্ধারই জীবনে একটা কৃষ্ণ দরকার। খুব দরকার।

সকাল ৯.‌১৫

কাল রাতে অন্তরার সঙ্গে মেসেঞ্জারে লম্বা কথা হল। যার অপারেটিভ পার্ট হল—

১.‌ ‘লকডাউন ডায়েরিটা বই হওয়া উচিত। এবং লকডাউন উঠে গেলেও ডায়েরিটা কিছুদিন চলা উচিত। দিস ডায়েরি আই বিলিভ ইজ ওয়ান অফ আ কাইন্ড। বিকজ ইট্‌স আ প্রেশাস টেক অন হাউ থিংস আর গোয়িং অ্যান্ড অলসো বিকজ নো ওয়ান এলস ইজ ডুয়িং ইট দ্য ওয়ে ইউ আর।’

২.‌ ‘আই ডোন্ট সে দিস মাচ। কিন্তু সাহস করে কিছু করাটা তোমার থেকেই শেখা। অনেক গালাগালের বিনিময়ে শিখেছি। কিন্তু শিখেছি। এবেলা থেকে বেরোনর পর বহুবার আমরা প্রত্যেকেই জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে একাধিকবার বলেছি, অনিন্দ্যদা থাকলে দেখতিস। সামটাইম্‌স ইট মেন্‌ট, অনিন্দ্যদা উড হ্যাভ ডান ইট ডিফারেন্টলি। সামটাইমস ইট মেন্‌ট, হি উড হ্যাভ ফট হার্ডার। আদার টাইমস ইট মেন্‌ট, ওহ্‌ শিট!‌ হি উড হ্যাভ স্ক্রুড আস ওভার দিস মিসটেক অ্যান্ড অ্যাট টাইম্‌স ইট অলসো মেন্‌ট, হি উড হ্যাভ শিল্ডেড আস ফ্রম দ্য সোর্স অফ ট্রাবল্‌স। এগুলো নিজেদের মধ্যে দেখা করে ছাড়াও অন্যান্য জায়গাতেও বলেছি দৃষ্টান্ত হিসেবে। মাথায় কিন্তু সকলের একটাই কথা ঘুরত, হি উড ফিল প্রাউড অফ আস ইফ হি ওয়াজ হিয়ার।’

৩.‌ ‘আমার নতুন কাজের জায়গাতেও সমস্ত সহকর্মীরা তোমায় চেনে। আগে থেকেই চিনত। আমার বস্‌ হিসেবে নয়। বাট নাউ দে ডু অ্যান্ড দে নো হাউ প্রাউড আই ফিল টু সে, আই ওয়ার্কড উইথ অনিন্দ্য জানা!‌ ওঁর থেকে এগুলো শিখেছি। এভাবে করতে হয়। এভাবে ভাবতে হয়। সাহস নিয়ে কাজ করতে হয়।’

৪.‌ ‘#‌মেন্টরফরএভার। পৃথা হ্যাজ পুট ইট ইন ওয়ার্ডস হোয়াট অল অফ আস ফেল্ট ইনসাইড।’

অন্তরাকে বললাম, তোদের নিয়ে আমার বড্ড গর্ব। একটা কথা আমি ভিতর থেকে বিশ্বাস করি— অর্জুন না থাকলে দ্রোণাচার্য কোনওদিন দ্রোণাচার্য হতেন না।

মনে হচ্ছিল, এই মধ্যবয়সে পৌঁছে অনেক বস্তুগত সঞ্চয় হেলাফেলায় স্যাক্রিফাইস করে এসেও ভাল থাকি এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর জন্যই। এই সার্টিফিকেটগুলো মনের‌ ম্যান্টলপিসের উপর যত্নে সাজিয়ে রাখি আর মাঝে মাঝে তাকিয়ে দেখি। জোর পাই। মনে হয়, ভুল করিনি। মনে হয়, ভাগ্যিস সেই সময়টা জীবনে এসেছিল!‌ এই মণিমুক্তোগুলো তো কুড়িয়ে নেওয়া গেল। ইউনিভার্সিটি থেকে পাস করে বেরোন ঝকঝকে ছেলেমেয়েগুলোকে বলেছিলাম, আগে ভাল মানুষ হতে হবে। সৎ হতে হবে। তারপর ভাল পেশাদার।

বলেছিলাম, কাউকে ভয় পাবি না। তোরা কারও চেয়ে ছোট নোস। মনে রাখবি, সততার একটা আলাদা তেজ থাকে। সেটা ক্ষাত্রতেজের মতো বিচ্ছুরিত হয়। আর অসৎ লোকদের গায়ে গিয়ে কাঁটার মতো বেঁধে। তাই তারা সৎ আর পরিশ্রমীদের টেনে নিজেদের লেভেলে নামানোর চেষ্টা করে। তোদেরও করবে। পাত্তা দিবি না।

ওরা দেয়নি। নিজেদের দাপটে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ওদের সাফল্যের সিঁড়ির কোনও একটা ধাপে আমার নামটা লেখা আছে দেখে মনে হয়, পরিশ্রম সার্থক। দিনের শেষে অন্তত কেউ না কেউ বলবে, ওই লোকটার সঙ্গে কাজ করে কিছু শিখতে পেরেছিলাম।

মেসেঞ্জারের কথোপকথন ডায়েরিতে লিখে দেওয়ায় অন্তরা কি কিছু মনে করবে?‌ নাহ্‌ বোধহয়। নিশ্চয়ই বুঝবে, এ হল আমার অক্সিজেন সিলিন্ডার। হুইচ আই অলওয়েজ ক্যারি অন মাই ব্যাক হোয়াইল আই ওয়াক অন দ্যাট আনট্রাভেল্‌ড পাথ। গড ব্লেস অন্তরা। গড ব্লেস অল।

বেলা ১১.‌০০

এইমাত্র ফিরলাম চেতলা থেকে। আগেরদিন যা আশঙ্কা করেছিলাম, গিয়ে দেখলাম সেটাই হয়েছে। সিআইটি মার্কেট সিল্‌ড। বড় বড় তালা ঝুলছে কোলাপ্‌সিবল গেটে। বাচ্চাদের মাছ–মাংস কিনতে গিয়ে ফিরে আসতে হল। বাইরে অবশ্য হাটবাজার বসেছে ঠিকঠাক।

ব্যাপার কী?‌

যা শোনা গেল, ব্যাপার গুরুচরণ। বারবার বলা সত্ত্বেও সকাল সাড়ে ১০টার মধ্যে মাছ–মাংসের বাজার বন্ধ হচ্ছিল না। শেষে পুলিশ এসে তালা মেরে দিয়েছে। সবকিছু লঘু এবং চপলভাবে নেওয়ার এটাই পরিণতি। সোজা আঙুলে ঘি ওঠেনি দেখেই বিদায়ী মেয়র আঙুল বাঁকিয়েছেন। বেশ করেছেন!‌

রক্ষে এই যে, বাজারের বাইরে একটা মাংসের দোকান খোলা ছিল। সেটা থেকে প্রয়োজন মিটল আপাতত। মাছটা অবশ্য হল না। চিন্তা রয়ে গেল। ব্যবস্থা করতে হবে কিছু একটা।

রোদ্দুরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে টি–শার্ট ভিজে গিয়েছিল। এরপর গাড়িতে ফুল ব্লাস্টে এসি চালালে ঘাম বসে ঠাণ্ডা লেগে গেলে হাঁচি অবধারিত। আর এখন হাঁচলে নিজেরই ভয় লাগছে। তাই এদিক–ওদিক তাকিয়ে রাস্তাতেই গাড়ির আবডালে টি–শার্ট বদলে নিয়েছি। জীবনে প্রথম। কিন্তু বেশ মজা লাগল।

দুপুর ১২.‌২৩

বীভৎস গরম। চেতলা থেকে ফিরে এসে ওয়ার্কআউট করতে গিয়ে কেলিয়ে পড়েছিলাম। ভাগ্যিস এক বোতল ইলেকট্রলের জল বানিয়ে রেখেছিলাম। সেটাই কোঁত কোঁত করে গিললাম।

অশোক’দা একটা পোস্ট এডিট লেখার নির্দেশ দিয়েছেন। যে করে হোক আজই লিখে ফেলতে হবে।

দুপুর ১২.‌৩৫

আমি কি হাফ দাড়ি রাখব?‌ নাকি চাঁছাপোঁছা মায়ের বাছা হয়ে থাকব?‌ এই গরমে ফুল দাড়ি রাখাটা খুব কামবারসাম। কুটকুট করে। তাছাড়া মাস্ক পরে থাকায় মুখে–গালে হাতও দেওয়া যাবে না। দাড়িতে হাত বোলানোর সুখ থেকে বঞ্চিত। ফলে ফুল দাড়ি রাখা যাবে না। আবার বেশি বড় হাফ দাড়িও রাখা যাবে না। সেটাও খুব বিশ্রি। অযথা পশ্চাৎপক্ক মনে হয়। আপাতত এই গুঁড়ি গুঁড়িটা থাকুক। স্টাব্‌ল। দেখা যাক, কতদিন মেনটেন করতে পারি। এটা অ্যাপারেন্টলি খুব চিন্তার বিষয় নয়। আবার ভেবে দেখলে চিন্তারও। গভীর চিন্তার।

সকালে বেরোনর সময় দেখলাম পাশের বাড়ির ভদ্রমহিলা গেট খুলে বাগানের ভিতরেই ঢুকে পড়েছেন ফুল তুলতে। ভাবেননি বোধহয় তখন আমি বেরিয়ে পড়ব। চোখাচোখি হতে একটু লাজুক হেসে বললেন, ‘ফুল নিচ্ছি একটু আপনাদের বাগান থেকে।’

আমি ওঁদের বাড়ির আমগাছের দিকে তাকিয়ে ভিতরে একটা হিংস্র আনন্দ অনুভব করতে করতে একগাল হেসে বললাম, নিন না। যতখুশি নিন।

দুপুর ২.‌৩০

বাইপাসের পরমা আইল্যান্ডের সামনে হাত দেখিয়ে গাড়ি থামিয়েছিল পুলিশ। মনে হল, আবার কেস খেলাম নাকি?‌ কিন্তু আজ তো স্পিড লিমিট ভাঙিনি!‌ রাস্তার পাশের স্পিড গান আর ড্যাশবোর্ডের স্পিডোমিটারের উপর কড়া নজর রেখেছিলাম। মুখে মাস্ক, হাতে সার্জিক্যাল গ্লাভসের সুঠাম চেহারার সার্জেন্ট এগিয়ে এসে প্রশ্ন করলেন, কোথায় যাচ্ছেন?‌

— অফিসে।

‘কোন অফিস?’‌

— আজকাল। আইডি দেখবেন?‌

ভদ্রলোক হাত বাড়ালেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অ্যাক্রিডিটেশন কার্ডটা দেখিয়ে ফেরত নেওয়ার সময় সামনে তাকিয়ে দেখলাম, এক পুলিশকর্মী মোবাইলে নম্বরপ্লেট–সহ গাড়ির ছবি তুলে রাখছেন। কার্ডটা ওয়ালেটে রেখে বললাম, এবার আমি জিজ্ঞাসা করতে পারি?

‘বলুন।’‌

— গাড়ির ছবি তুলছেন কেন?‌

‘আসলে আমরা এখানে নাকা চেকিং করছি। তার ডকুমেন্টেশনের জন্য।’

ছাড়া পেয়ে তাড়াহুড়োয় গাড়ি এগোতে যাচ্ছি, সার্জেন্ট বললেন, ‘সিগনালটা হলে যান।’ ভাল লাগল। লকডাউনে এমন নজরদারিই দরকার। কেউ কার্ড দেখতে চাইলে অনেক রিপোর্টারই কুপিত হন। অপমানিত বোধ করেন। কেন করেন কে জানে!‌ আমি কখনও করি না। কারণ মনে করি, কার্ডটা দেওয়া হয় দেখানোর জন্যই। ওটা আইনি এবং বৈধ পরিচয়পত্র। কার্ড দেখতে চাওয়া যেমন পুলিশ বা অন্য প্রশাসনিক আধিকারিকদের কাজ, তেমনই আমার এবং সকলেরই কাজ বিনা বাক্যব্যয়ে কার্ডটা দেখানো। এটা শৃঙ্খলা। এটা নিয়ম। এর মধ্যে ফালতু ইগো আসে কোত্থেকে?‌

বিকেল ৪.‌‌৩০

কাল দুপুর তিনটেয় আবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেশের মুখ্যমন্ত্রীদের ভিডিও বৈঠক। সম্ভবত লকডাউন তোলা নিয়ে কথা হবে। ১৭ মে তো প্রায় এসেই গেল। লকডাউন থাকলে লোকে এবার না খেয়ে মরবে। আর লকডাউন তুললে করোনায়। এগোলে নির্বংশের ব্যাটা, পিছোলে আঁটকুড়োর। কী করবি এবার কর!‌

বিকেল ৫.‌২৭

সারা দেশে এখনও পর্যন্ত লকডাউনের বলি ৩৮৬ জন!‌ ভাবা যায়?‌ করোনায় আক্রান্ত হয়ে নয়। তার পরোক্ষ অভিঘাতে। এর মধ্যে প্রথমসারিতে সেই পরিযায়ী শ্রমিকরাই। গতকাল রাতেও মধ্যপ্রদেশে আম–বোঝাই লরি উল্টে পাঁচ পরিযায়ী শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আর হাঁটতে হাঁটতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন আরও তিনজন।

আজ বাইপাস দিয়ে আসার সময় জনা ১০–১২ যুবককে হাঁটতে দেখলাম। সকলের পিঠে সস্তাদরের ব্যাকপ্যাক। মুখে রুমাল বাঁধা। ঠিক যেমন দেখি দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছবিতে রোজ রোজ। অন্তহীন হাঁটছে। মনে হয়েছিল, একবার গাড়ি থামিয়ে কথা বলি। কিন্তু অফিসে আসার তাড়া ছিল। দ্বিতীয়ত, আমার ভিতরের শকুনি রিপোর্টারটাও বোধহয় মরে গিয়েছে। সেটা ভাল না খারাপ বুঝলাম না।

সন্ধ্যা ৭.‌৩৪

বিপ্লবের স্যানিটাইজার–বিপ্লব!‌ এতবার হাত ধোয় সারাদিন যে, বিরক্ত হয়ে বললাম, এবার থেকে হাত ধোয়ার সঙ্গে সঙ্গে দু’চামচ করে খেয়েও নিস!‌ একটুও না রেগে প্রচণ্ড স্মার্ট গলায় বিপ্লব বলল, ‘খেয়েছিলাম তো একদিন।’

বলে কী?‌ খেয়েছিলাম?! ‌নাহ্‌, অতটাও নয়। প্রায় খেতে যাচ্ছিল। টেবিলে জলের বোতলের পাশে স্যানিটাইজারের বোতল রাখা ছিল। অন্যদিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে স্যানিটাইজারের বোতল তুলে গলায় ঢালতে গিয়ে শেষমুহূর্তে ব্রেক কষেছে। কিন্তু এর ফলে মানবসভ্যতা একটি যুগান্তকারী এক্সপেরিমেন্ট থেকে বঞ্চিত হল— মানব পাকস্থলিতে স্যানিটাইজারের প্রভাব। কে জানে, হয়ত এটা নিয়ে কত লোকে পিএইচডি–ও করে ফেলত আর বিপ্লবের নাম স্বর্ণাক্ষরে ইতিহাসে লেখা থাকত। বললাম, কী চান্স যে মিস্‌ করলি, বুঝতেও পারছিস না। বিপ্লব ওর সেই মিঠে হাসিটা হাসল। আমিও হাসলাম।

রাত ৯.‌‌০০

মঙ্গলবার থেকে ধাপে ধাপে যাত্রীবাহী ট্রেন চালানো শুরু হচ্ছে। তেমনই ঘোষণা করল রেলমন্ত্রক। ১৫ জোড়া বিশেষ ট্রেন চালানো হবে দিল্লি থেকে। ১৫টি প্রান্তিক স্টেশন পর্যন্ত। তার মধ্যে হাওড়াও আছে। সোমবার, মানে কাল থেকে অনলাইন বুকিং শুরু। স্টেশনে টিকিট কাটার গল্প নেই। প্ল্যাটফর্ম টিকিটও পাওয়া যাবে না। বৈধ টিকিট ছাড়া কাউকে ট্রেনে উঠতে দেওয়া হবে না। ট্রেনে ওঠার আগে সকলের স্বাস্থ্যপরীক্ষাও করা হবে।

এটা কি লকডাউন আংশিক তুলে নেওয়ার ইঙ্গিত?‌ সম্ভবত তা–ই। এটা একটা পরীক্ষামূলক সিদ্ধান্ত। তেমন বুঝলে বোধহয় আবার প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। আসিড টেস্ট। একেবারে অ্যাসিড টেস্ট।

রাত ১০.‌‌২০

বুকে ব্যথা নিয়ে মনমোহন সিংহ এইমসে ভর্তি। আপাতত কার্ডিওথোরাসিক ইউনিটে। প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়েই বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। তারপর থেকে হাত নাড়ার সময় উপরে তুলতে পারতেন না। দেহের সমান্তরালে হাত নাড়াতেন পুতুলের মতো। সেটা নিয়ে কত হাসাহাসি করেছি। নকল করেও দেখিয়েছি অনেককে।

কিন্তু অসুস্থ হওয়ার পক্ষে এটা ভাল সময় নয়। কোনওমতে খবরটা পেজ ওয়ানে ধরালাম।

রাত ১০.‌৪০

একটু আগে বৃষ্টি হয়ে গেল একপশলা। আজ মাতৃদিবস ছিল। দীর্ঘ দগ্ধদিনের পর এই ধারাস্নানে ধরিত্রী মায়ের বুক একটু জুড়োল কি?‌

লকডাউন ডায়েরি – ৯ মে, ২০২০

০৯.‌০৫.‌২০২০। শনিবার

সকাল ৯.‌৪৫

শেষপর্যন্ত গতকাল সত্যিকথাটা বলে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যসচিব— ভবিষ্যতে করোনাকে সঙ্গে নিয়েই আমাদের বাঁচতে হবে। একদিক থেকে এটা হাল ছেড়ে দেওয়া। অন্যদিক থেকে এটাই শাশ্বত সত্য। কারণ, আমাদের মতো দেশে সংক্রমণ ঠেকানো যাবে না। কতদিন এই লকডাউন চলবে?‌ গোটা দেশ থেমে আছে। সব ওলটপালট। কোনও না কোনওদিন তো স্বাভাবিকতায় ফিরতে হবে। সেটা যতই অস্বাভাবিক হোক।

আর শুধু আমাদের মতো দেশই বা কেন?‌ সিঙ্গাপুরও তো করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে পারেনি। ওইরকম একটা বজ্র আঁটুনির দেশ। যেখানে মাদক পাচারের শাস্তি মৃত্যু। রাস্তায় থুতু ফেললে জেল। আইন ভাঙলে পশ্চাদ্দেশে বেত্রাঘাত। সেখানেও ধমকে–চমকে করোনার সংক্রমণ ঠেকানো যায়নি। আবার পাশাপাশিই মনে হয়, তাহলে কেরল কী করে পারল?‌ ওই রাজ্যটাও তো আমাদেরই দেশের অঙ্গ।

তাহলে কি মানুষ চাইলে সব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে?‌ তার হাতেই থাকে ভবিষ্যতের চাবিকাঠি?‌ সত্যি সত্যিই ইচ্ছে থাকলে উপায় হয়?‌

সকাল ১০.‌০৩

অমিত শাহের চিঠি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীকে। বক্তব্য, পরিযায়ী শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে না পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ওই শ্রমিকদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য ট্রেন দেওয়ার আবেদন করছে না তারা। ভিন রাজ্য থেকে ট্রেন ঢোকার অনুমতিও দিচ্ছে না রাজ্য প্রশাসন। কারণ, আসলে তারা সংক্রমণের ভয়ে বিভিন্ন রাজ্যে আটকে–পড়া পরিযায়ী শ্রমিকদের রাজ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে চাইছে না। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লিখেছেন, গোটা দেশেই পরিযায়ী শ্রমিকরা নিজের রাজ্যে ফিরছেন। কেন্দ্রীয় সরকার সেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। ইতিমধ্যেই প্রায় ২ লাখ শ্রমিক ফিরে গিয়েছেন। আরও ফিরছেন। সব রাজ্যই নাকি তাদের বাসিন্দা পরিযায়ী শ্রমিকদের ফেরানোর জন্য ট্রেন চেয়ে চিঠি লিখছে। একমাত্র ব্যতিক্রম পশ্চিমবঙ্গ। এবং পশ্চিমবঙ্গের এই ভূমিকায় অমিত ব্যথিত। তাঁর যন্ত্রণা হচ্ছে!‌

এই চিঠির অভিঘাত কিন্তু বহুদূর যাবে। তৃণমূলের তরফে কড়া প্রতিক্রিয়া এল বলে। তারপর দেখা যাক কোথাকার রেল কোথায় গড়ায়।

বেলা ১১.‌২৫

যা ভেবেছিলাম। লড়াই জমে গিয়েছে। সৌগত রায় ইতিমধ্যেই বলেছেন, অমিত শাহ অসত্য বলছেন। অভিষেক ব্যানার্জি টুইট করে দাবি করেছেন, অসত্যভাষণের জন্য অমিত শাহকে ক্ষমা চাইতে হবে। আপাতত ঠিক হয়েছে, দুপুরে ভিডিও প্রেস কনফারেন্স করে ডেরেক ও’ব্রায়েন, রাজীব বন্দ্যোপাধ্যায় এবং কাকলি ঘোষ দস্তিদার বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন। সোজা কথায়, অমিত শাহকে ঝাড়বেন।

দুপুর ১২.‌১৮

আমার এদিকেও খেলা জমেছে।

ওয়ার্কআউট করতে করতে তিনটে ফোন এল। প্রথমটা জনসংযোগমূলক। খেজুরে। বললাম, পরে কর‌ছি। দ্বিতীয়টা জিডি মার্কেট থেকে। পার্কারের রোলার রিফিল এসে গিয়েছে। দুপুর ১টা পর্যন্ত দোকান খোলা থাকবে। চাইলে গিয়ে নিয়ে নিতে পারি। খুবই জরুরি ইনফর্মেশন। প্রভূত কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বললাম, আজ আর যাচ্ছি না। কাল সকালে গিয়ে নিয়ে নেব। তৃতীয় ফোনটা সুভাষ ভৌমিকের। ধরতেই হল। ‘বলুন’ বলার সঙ্গে সঙ্গে ভাঙা গলা বলল, ‘কী করছো?‌ হাঁফাচ্ছো কেন?‌’

বললাম, ভয় পাবেন না। কোভিড হয়নি। এটা শ্বাসকষ্ট নয়। আসলে আউটডোর গেম্‌স আর অ্যাক্টিভিটি বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে কিছুদিন ধরে বাড়িতেই ওয়ার্কআউট শুরু করেছি। সেটাই করছিলাম। তাই হাঁফাচ্ছি।

‘বাহ্‌, কিন্তু কোর এক্সারসাইজগুলো বেশি করে করো। যেন ভুঁড়িটা না হয়।’

বললাম, সেই চেষ্টাতেই রোজ এই প্রাণপাত করে পলাশির প্রান্তরে খাপ খুলতে অবতীর্ণ হওয়া। খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সুভাষ’দা বললেন, ‘গানটা কি এখনও গাওয়া হয়?‌’ আমি নিরুত্তর। ওপাশ থেকে ভেসে এল, ‘এসব লকডাউন–টাউন উঠে যাওয়ার পর একদিন বাড়িতে এসো। অনেকদিন তোমার গান শুনি না।’

হে ধরণি!‌ আবার দ্বিধা হও।

সুভাষ’দার ফোন ছেড়ে কপালে আঙুল ঠেকিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করলাম। রিফিলটা নেওয়ার জন্য কি কাল পর্যন্ত ওয়েট করব?‌ নাকি আজই নিয়ে আসব?‌ এখন বাকি ওয়ার্কআউটটা করে নেব?‌ মনের ভিতরে শুম্ভ–নিশুম্ভের লড়াই শুরু হল।

শুম্ভ বলল, শরীরের চেয়ে মেধা এবং মননকে বেশি গুরুত্ব দাও। তুমি সলমন খান নও। শরীরের সঙ্গে তোমার চাকরির কোনও সম্পর্ক নেই। তোমার ক্ষুন্নিবৃত্তি হয় মেধা বিক্রি করে। তোমার হাতিয়ার কলম। তাতে কালি না থাকলে যুদ্ধে জিতবে কী করে?‌ তাছাড়া জিডি মার্কেট এবং সুভাষ’দার ফোনে ওয়ার্কআউটের তাল কেটে গিয়েছে। কথা বলতে বলতে ফ্যানের হাওয়ায় ঘাম ইতিমধ্যেই কিছু জুড়িয়ে গিয়েছে। কয়লার ইঞ্জিন আবার চালু করতে সময় লাগবে। সেই সময়টা দিতে দিতে বাবা–মা’কে খেতে দেওয়া এবং ঘর মোছার সময় চলে আসবে। তখন আবার রিফিলের দোকান বন্ধ হয়ে যাবে। কাল যদি না যাওয়া হয়?‌ রিস্ক নিয়ে কী হবে?‌ ফলে এখন রিফিল কিনতে যাওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।

নিশুম্ভ বলল, এ যুক্তি ফাঁকিবাজের। আসলে তুমি ওয়ার্কআউটটা পুরো করতে চাইছো না। এখনই গরমে কেলিয়ে পড়েছো। তাই রিফিলের অজুহাত দিয়ে কেটে যেতে চাইছো। রুটিনটা ফলো করো। জীবনে শৃঙ্খলা রাখো। ‘সুলতান’–এর সলমন খান বা ‘গজনি’–র আমির খান হতে হবে না। সেটা তোমার ধকে কুলোবেও না। কিন্তু ফিটনেস রেজিমটা রাখা জরুরি। দিনে এই একটা ঘন্টা নিজেকে দাও। ঝরঝরে থাকো। মহাজ্ঞানীরা বলে গিয়েছেন। কথা শোনো।

আরও দু’মিনিট যুদ্ধ হল। তারপর যা হওয়ার ছিল, তা–ই হল। শুম্ভ জিতে গেল।

একলম্ফে নীচে গিয়ে গাড়ি বার করে জিডি মার্কেটে চলে গেলাম। চার–চারটে রোলার রিফিল কিনেছি। যদিও দরকার ছিল কালো আর নীল কালির ‘আল্ট্রা ফাইন’। ওটাই প্রথম পছন্দ। সেটা আসেনি। তবে সেটাও চলে আসবে বলে জানা গেল। ওই দোকানেই কুইকফিক্স পাওয়া গেল। স্নিকার্সের সোল সারাতে কাজে লাগবে।

ঘামতে ঘামতে বিজয়দর্পে ফিরেছি।

দুপুর ১.‌৩২

লেগে গিয়েছে নারদ–নারদ। ডেরেক, কাকলি’দি আর রাজীব ধুনে দিচ্ছেন অমিত শাহকে। তাঁরা বলছেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী লকডাউন ঘোষণার অব্যবহিত পরেই ১৮টি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে চিঠি লিখে বলেছিলেন, বাংলার পরিযায়ী শ্রমিকদের দেখভাল করতে এবং সুরক্ষিত রাখতে। সেটা জানানোর পাশাপাশিই তাঁরা বলছেন, ইতিমধ্যেই দুটো ট্রেন রাজ্যে এসে পৌঁছেছে পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে। আরও আটটি ট্রেন ছাড়ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চারটি রাজ্য থেকে। সেগুলো পরপর ঢুকবে। কত শ্রমিক রাজ্যে ফিরেছেন, আরও কতজন আসছেন— সমস্ত তালিকা হাতে করে বসেছেন ডেরেক। সেটাই করা উচিত।

বাবুল সুপ্রিয়র অবশ্য দাবি, ‘অমিত শাহের চিঠির পরেই আটটা ট্রেনকে ঢুকতে অনুমতি দেওয়া হয়েছে।’ আর অধীর চৌধুরির বক্তব্য, ‘আমি অমিত শাহের সঙ্গে কথা বলার পর আটটা ট্রেন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই আটটা ট্রেনে হবে না। লাখো লাখো বাংলার মানুষ আটকে রয়েছেন। তাঁদের ফেরাতে অবিলম্বে আরও ট্রেন দরকার।’

ব্যক্তিগতভাবে মনে হচ্ছে, এটা বিজেপি–র ব্যাড পলিটিক্স। যেখানে অলরেডি পরিযায়ী শ্রমিকরা রাজ্যে এসে পৌঁছে গিয়েছেন এবং ঘটনাচক্রে, তাঁদের মধ্যে চারজনের দেহে সংক্রমণ ধরাও পড়েছে, সেখানে এই চিঠি লেখা অর্থহীন। তবে মনে হচ্ছে এটা আরও বড় গোলমালের দিকে যাবে। রাজনীতি রাজনীতির মতো চলবে। মাঝখান থেকে লোকগুলো এ–দরজা ও–দরজায় ঠোক্কর খেতে থাকবে। যেমন হয়ে এসেছে। কেউ বলবে না যে, একটা কল্যাণকামী গণতন্ত্রে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের বাঁচানো রাষ্ট্রের দায়িত্ব। বলবে না যে, মাত্র চারঘন্টার নোটিশে দেশ জুড়ে লকডাউন ঘোষণা করার সময় এঁদের ধর্তব্যের মধ্যেই আনা হয়নি। কারণ, এঁদের নিয়ে কেউ ভাবে না। ভাবেনি কোনওদিন। চিরকাল এঁদের ভেড়ার পাল হিসেবে ট্রিট করা হয়েছে। রাজনীতির চৌষট্টি খোপের খেলায় এঁদের ব্যবহার করা হয়েছে বটে। কিন্তু নিছক বোড়ে হিসেবে, যা দাবাখেলায় সবচেয়ে কমদামী ঘুঁটি। বাকি সময়ে এঁদের আগাছার মতো দেখা হয়েছে। যাদের জন্ম, যাপন এবং মৃত্যু সবই রাস্তার নর্দমার পাশে।

কাল একটা টুইট করেছিল বীর সাংভি— ‘ইজ এনিওয়ান গোয়িং টু মেক আ মুভি অন দ্য ম্যাসিভ হিউম্যান ট্র্যাজেডি অফ দিস মাইগ্র্যান্ট এক্সোডাস?‌ অর ইজ বলিউড টু বল–লেস অ্যান্ড সোল্ড আউট নাউ?‌’

বীর প্রতিভাশালী সম্পাদক। ওর লেখার আমি ভক্ত। এত লুসিড ইংরেজি খুব কম পড়েছি। এমনকী, খাবার নিয়ে লেখা সাপ্তাহিক কলাম ‘রুড ফুড’ও আগ্রহ নিয়ে পড়তাম। পাশাপাশি, বীর বলিউডের অন্দরমহলের ঘাঁতঘোঁত নিয়েও খবর রাখে। তাই এই টুইট আরও অর্থবহ। সম্ভবত ও ঠিকই ভেবেছে। বলিউডে আরও গোটাকয়েক ‘উরি’ তৈরি হবে। কিন্তু এই লোকগুলোর যন্ত্রণাটা কেউ ঘাঁটতে যাবে না। কারণ, ‘ওনলি সেক্স অ্যান্ড এসআরকে সেল্‌স ইন ইন্ডিয়া’।

অথচ এতদিন টানা লকডাউনের মধ্যে সম্ভবত সবচেয়ে অভিঘাত তৈরি করেছে এই পরিযায়ী শ্রমিকদের লড়াই। তাদের জীবন এবং তাদের অন্তহীন মরিয়া যাত্রা। চেন্নাইয়ে লাঠির বাড়ি। সুরাতে কাঁদানে গ্যাস। আর কত মারবে জীবন!‌ যখন বিরক্ত বা একঘেয়ে লাগে, তখন ওদের ছবিগুলোর দিকে তাকাই। আকুতি আর অসহায়তা ভরা দৃষ্টিগুলো তিরের মতো এসে বেঁধে। ভাবি, অনেক ভাল আছি। অনেক!‌

দুপুর ১.‌৩৫

সূর্যকান্ত মিশ্র বিবৃতি দিয়েছেন, ‘যে খবর ছড়ানো হচ্ছে, তা ভিত্তিহীন। কমরেড বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য সুস্থ আছেন’।

হঠাৎ?‌ কী খবর ছড়ানো হচ্ছিল?‌ কেনই বা?‌ এটা কী ধরনের বাঁদরামি?‌ বুদ্ধবাবু অসুস্থ। অনেকদিন ধরেই অসুস্থ। অক্সিজেন সিলিন্ডার ছাড়া ঘরেও হাঁটাচলা করতে কষ্ট হয়। কিন্তু এমন কদর্য গুজব কেন রটানো হবে?‌ এবং সেই গুজব এতটাই ডালপালা মেলল যে, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদককে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দিয়ে সেটা অস্বীকার করতে হল?‌ ছি–ছি!‌

দুপুর ১.‌৪৪

রুদ্রনীলের একটা বাচিক অভিনয়ের ভিডিও পেয়েছি। একটা কবিতা। ‘ভাল আছি’। চমৎকার!‌ খুব অনেস্ট লেখা। কোথাও কোথাও একটু কাঁচা। একটু ছন্দপতনও আছে। কিন্তু সৎ। এডিটিং ভাল। সাউন্ড ভাল। মিক্সিং ভাল। সবচেয়ে ভাল যে, সাদা–কালোয় বানানো। এই লকডাউনের মধ্যে অনেকের অনেক শিল্পকর্ম নজরে এসেছে। এখনও পর্যন্ত এটাই সেরা।

‘ফ্যাতাড়ু’ এবং পুরন্দর ভাট থেকেই রুদ্রর অভিনয়প্রতিভার ভক্ত আমি। মাঝখানে একটু কেমন যেন হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু এটা একেবারে সলিড নামিয়েছে। রুদ্রকে সেটা জানালাম। একটি ভালবাসা এবং চারটি ফুলের ইমোজি–সহ জবাব এল, ‘ধন্যবাদ গো’। অশোক’দা একবার লিখেছিলেন, অমুকের মুখের ওই ‘গো’টা তপ্ত বৈশাখে ফ্রিজ থেকে সদ্য বার করা থাম্‌স আপের মতো। রুদ্ররটাও তেমনই মনে হল। কারণ, গরমটা ফাটিয়ে পড়েছে। যাঁরা সোশ্যাল মিডিয়ায় আদিখ্যেতা করে লিখছিলেন, মে মাসেও ফ্যান কম স্পিডে চালিয়ে গায়ে চাদর দিতে হচ্ছে, ছাতা ছাড়া এই রোদে রাস্তায় দাঁড় করিয়ে তাঁদের ইন্টারভিউ নিতে ইচ্ছে করছে!‌

দুপুর ২.৩৮

চশমা খুললে নিজেকে ইদানীং ‘অন্ধা কানুন’–এর প্রেম চোপড়ার মতো লাগে। চারদিক ঝাপসা। প্রায় অন্ধ হওয়ার মতো। একটা সময়ে কেতা করে পাওয়ারলেস চশমা পরতাম। যাতে বয়সের তুলনায় একটু পাকা আর পরিণত লাগে। এখন বুঝতে পারি, কী গয়নার জন্য হা–হুতাশ করেছিলাম!‌ রাতে বেডসাইড টেবিলে চশমা রেখে শুতে হয়। রাতে ফোন এলে যাতে ঠিকঠাক নামটা দেখতে পারি।

দুপুর ৩.৩০

বীরভূমের নলহাটিতে প্রায় ঔরঙ্গাবাদের পুনরাবৃত্তি হতে যাচ্ছিল। লাইন ধরে হাঁটার সময় পাকুড় থেকে আসা ইন্সপেকশন ট্রেনের সামনে প্রায় পড়ে গিয়েছিলেন একদল শ্রমিক। ২০ জনের দলটা ১২০ কিলোমিটার হেঁটে বাড়ি ফিরছিল। কোনওক্রমে ব্রেক কষে ট্রেন থামিয়েছেন চালক। ভাগ্যিস!‌ তাঁদের উদ্ধার করে আপাতত প্রশাসনের আশ্রয়ে রাখা হয়েছে। চেষ্টা হচ্ছে বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার।

বিকেল ৪.‌০৫

আবার দৈনিক প্রেস ব্রিফিংয়ে আলাপন’দা। পরিযায়ী শ্রমিক নিয়ে বলছে। বলছে, রাজ্যের বিভিন্ন দিকের সীমান্তে পরিযায়ী শ্রমিকরা হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছেছেন বাড়ি ফেরার পথে। তাঁদের সরকারি বাস বা বেসরকারি বাস রিকুইজিশন করে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আলাপন’দা জানাচ্ছে, করোনা এবং কো–মর্বিডিটি মিলিয়ে রাজ্যে এখনও পর্যন্ত মৃত ১৭১ জন। গত ২৪ ঘন্টায় রাজ্যে মৃত ১১ জন।

স্কোরবোর্ড চালু আছে। সিঙ্গলসেই খেলছে। বড় শট নিচ্ছে না। কিন্তু আলাপন’দার ব্যাটে টুকটুক করে রান বাড়ছে।

সন্ধ্যা ৭.‌০৫

পুনের রেললাইনে আবার একদল ক্লান্ত পরিযায়ী শ্রমিক। ধ্বস্ত অবস্থায় বসেছিলেন। দূর থেকে দেখতে পেয়ে ট্রেন থামিয়েছেন চালক। এটা কিন্তু একটা নিয়মিত ফিচার হয়ে গেল। পরিযায়ী শ্রমিক–ট্রেন–মৃত্যু। এই ত্রিভুজ থেকে কি কখনও মুক্তি পাওয়া যাবে?‌

রাত ৮.০৩

নাছোড় ‌রাজ্যপাল আবার কলকাতা পুরসভা নিয়ে টুইট করেছিলেন। এবার ব্যাপক চটেছেন কলকাতা পুরসভার মুখ্য প্রশাসক (‌এখন আর ‘মেয়র’ বলা যাবে না)‌ ফিরহাদ হাকিম। ঝোড়ো অতীত পিছনে ফেলে ববি এখন অনেকটাই মেলোড ডাউন করে গিয়েছেন। ঠান্ডামাথায় যাবতীয় পরিস্থিতির মোকাবিলা করেন। কিন্তু আজ যে উত্তেজিত গলায় তিনি জবাব দিলেন, তা সাম্প্রতিক অতীতে তাঁকে করতে দেখিনি।

গলা চড়িয়ে ক্যামেরার সামনে ফিরহাদ বললেন, ‘উনি তো দিব্যি আছেন!‌ দোতলা থেকে নেমে এসে গালাগাল দিয়ে আবার উঠে যাচ্ছেন। ওঁর তো আর কোনও কাজ নেই। আরে, আমি কি প্রশাসক হতে চেয়েছি?‌ নবান্ন করেছে। আমরা না থাকলে কাজগুলো কারা করত?‌ আছে কোনও বিকল্প ব্যবস্থা?‌ এই সময়ে আমরা বাড়িতে বসে থাকলে আমাদের বাড়ির লোকও খুশি হতো। কিন্তু আমরা রাস্তায় বেরিয়ে কাজ না করলে কাজগুলো হবে কী করে?‌’

ববি কি একটু বিরক্ত হয়ে পড়ছেন?‌ তিনি কি জানেন না যে, রাজ্যপাল একটা স্নায়ুর লড়াইয়ে নেমেছেন?‌ কাজকর্ম দেখেই তো বোঝা যাচ্ছে, প্রশাসনকে ক্রমাগত ইরিটেট করে যাওয়াটাই তাঁর লক্ষ্য। ইট্‌স লাইক হু ব্লিঙ্কস ফার্স্ট। ফিরহাদের চোখের পলক কি পড়ে গেল?‌ নাকি তিনি জোরে বোলারকে ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে গ্যালারিতে ফেলার স্ট্র্যাটেজি নিয়েছেন?‌

রাত ৯.৩২

আবার কেন্দ্রীয় দল আসছে রাজ্যে। অতএব, আবার গোলমাল। তবে শুধু এ রাজ্যে নয়। আরও ৮ টা রাজ্যে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় দল। উত্তরপ্রদেশ, দিল্লি, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ, পাঞ্জাব, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং তেলেঙ্গানা।

রাত ১০.‌০০

স্পেশাল ট্রেন ধরতে গিয়ে গতকাল ঔরঙ্গাবাদে মালগাড়ির চাকায় পিষ্ট শ্রমিকদের দেহাংশ তাঁদের মধ্যপ্রদেশের বাড়িতে পাঠানো হচ্ছে একটি স্পেশাল ট্রেনে।

এই পরিহাসটাও হওয়ার ছিল!‌

লকডাউন ডায়েরি – ৮ মে, ২০২০

০৮.‌০৫.‌২০২০। শুক্রবার

সকাল ৮.‌৪০

আবার একটা খারাপ সকাল। ঔরঙ্গাবাদের জালনায় ১৬ জন পরিযায়ী শ্রমিককে পিষে দিয়ে গিয়েছে একটা মালগাড়ি। টানা ৪৫ কিলোমিটার হাঁটার পর তাঁরা ক্লান্ত হয়ে রেললাইনের উপরেই ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। দলে ছিলেন ১৯ জন শ্রমিক। মারা গিয়েছেন ১৬ জন। বাকিরা গুরুতর আহত। টিভি বলছে, ওই শ্রমিকরা একটি ইস্পাত কারখানায় কাজ করেন। জালনা থেকে যাচ্ছিলেন ভুসাওয়াল। ঔরঙ্গাবাদ থেকে ট্রেন ধরার কথা ছিল নাকি।

তাত্ত্বিক এবং রেলের কর্তারা নিশ্চয়ই বলবেন, রেললাইন ধরে তো রেলগাড়ি যাবে। মানুষ যাবে কেন?‌

সত্যিই তো। রেললাইন ধরে মানুষ যাবে কেন?‌ মানুষ যায়ওনি তো। কারণ, যাঁদের মাথা গুঁড়িয়ে গেল ভীমবেগে আসা রেলগাড়ির লোহার চাকার নীচে, তালগোল পাকিয়ে মাংসের মণ্ড হয়ে গেল দেহ, তাঁরা তো আসলে মানুষ নন!‌ তাঁরা পরিযায়ী শ্রমিক। একেবারে অন্য একটা প্রজাতি। যাঁরা গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির মতো বিন্দুতে বিন্দুতে ছেয়ে ফেলেছেন এই দেশের পথঘাট। অতিমারীর ধোঁয়ায় কাতারে কাতারে, দলে দলে, লক্ষে লক্ষে তাঁরা বেরিয়ে এসেছেন কোটর থেকে। গর্ত থেকে। এসে পড়েছেন ভদ্রলোকদের চোখের সামনে। আর ভেবে পাচ্ছেন না কোথায় লুকোবেন। কীভাবে লুকোবেন।

ঠিকই তো। ওই নিহতেরা তো মানুষ নন!‌ তাঁরা পরিযায়ী শ্রমিক। ভাষান্তরে, মনুষ্যেতর প্রাণী। সমাজের উচ্ছ্বিষ্টভোগী, কোণঠাসা, নাচার। তাঁরা যেনতেন প্রকারেণ ঘরে পৌঁছতে চান। বড় রাস্তা দিয়ে গেলে পাছে পুলিশ ধরে! পাছে তাঁদের ভিখিরির ঝুলি হাতড়ে লকডাউনে বাইরে বেরোনর দাদন নেয়! তাই তাঁরা রেললাইন ধরে শর্টকাট করেন। আর ‌একটা সময়ে হা–ক্লান্ত অবস্থায় ঘুমিয়ে পড়েন রেললাইনের বালিশে মাথা রেখে। পিঠের তলায় কংক্রিটের স্লিপার আর পাথরের টুকরোর গদি। মাথার উপর থালার মতো পূর্ণিমার গোল চাঁদ। কী রোমান্টিক!‌ না? ‌

তাঁরা কি ভেবেছিলেন, ভোরের আলো ফোটার পরে পরেই তাঁদের যাত্রা শুরু হবে অনন্তের পথে?‌

সকাল ৯.‌৪৫

নরেন্দ্রপুরের বন্ধু এবং অধুনা রেলের দায়িত্বশীল অফিসার নীলাঞ্জনকে বিলাসপুরে ফোন করলাম। ও তখনও বাড়িতে। অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। শুনেই বলল, ‘তাহলে তো লম্বা সাইরেন বেজেছে!’

‌মানে?‌

জানা গেল, কোথাও কোনও রেলদুর্ঘটনা হলেই সংশ্লিষ্ট ডিভিশনের হেড কোয়ার্টারে সাইরেন বাজিয়ে দেয় কন্ট্রোল রুম। দুর্ঘটনায় প্রাণহানি হলে পরপর তিনবার লম্বা সাইরেন বাজে। অনেকক্ষণ ধরে। প্রাণহানি না হলেও তিনবারই সাইরেন বাজে। কিন্তু শর্ট ডিউরেশনে। পুরো রেল কলোনিতে সেই সাইরেন শোনা যায়। তার আওয়াজও নাকি বিটকেল!‌ শুনলেই পিলে চমকে যায়। তখন যে যেখানে আছেন রেলের অফিসাররা, শার্ট–পেন্টুলুন গলিয়ে অফিসে দৌড়োন।

এটা জানতাম না। বিপুলা এ পৃথিবীর কতটুকু জানি?‌ জানলাম। শিখলাম। যতদিন বাঁচি, ততদিন শিখি।

সকাল ১০.‌০০

একটা প্রশ্ন টিকটিক করছিল ভিতরে। ১৯ জনের পরিযায়ী শ্রমিকের ওই দলটা কেন রেললাইনের উ‌পর ঘুমিয়ে পড়ল? তারা তো লাইনের পাশেও ঘুমোতে পারত। কিম্বা পাশের ঝোপজঙ্গলের ধারে। কেন লাইনের উপর?‌

ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় জানি, দূর থেকে ট্রেন আসার সময় লাইনে হাত রাখলে একটা কাঁপন ধরা পড়ে। কান পাতলে একটা দূরাগত গুমগুম আওয়াজ পাওয়া যায়। ছোটবেলায় হিন্দু স্কুল থেকে বাড়ি ফিরতাম স্কুলের উড়িয়া বেয়ারা দুর্যোধন’দার সঙ্গে। কখনও কখনও হাত ছাড়িয়ে উল্টোডাঙ্গা স্টেশনের লাইনে কান পাততাম। হাত রাখতাম। ওই শ্রমিকরা শুনতে পেলেন না? কতদিনের কালঘুমে আছন্ন ছিলেন তাঁরা? পাড়ি দিয়েছিলেন কতটা পথ? যে ঘুমে অচেতন হয়ে গেলেন? আর উঠলেন না।

মুম্বইয়ে ফোন করে যা জানলাম, তা সত্যি হলে ভয়াবহ!‌ ওই শ্রমিকদের কে বা কারা বলেছিল, ঔরঙ্গাবাদ থেকে ‘শ্রমিক স্পেশাল’ ট্রেন ছাড়বে। সেটা যাবে ভুসাওয়াল। ওই পরিযায়ী শ্রমিকরা সেই ট্রেন ধরতেই রেললাইন ধরে ঔরঙ্গাবাদের দিকে রওনা দিয়েছিলেন। কিন্তু পৌঁছতে পারেননি। তখনও অনেক রাস্তা বাকি। ফলে তাঁরা ঠিক করেছিলেন, লাইনের উপর শুয়ে থাকবেন। যাতে দূর থেকে ট্রেন আসার আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেলে তাঁরা মাঝপথে ট্রেন থামিয়ে তাতে উঠে পড়তে পারেন।

এই তথ্যের কোনও সরকারি পুষ্টি হওয়া কঠিন। সম্ভবত কখনও হবেও না। কিন্তু বারবার মনে হচ্ছিল, একটা মিথ্যে খবরের ভিত্তিতে বেঘোরে এতগুলো প্রাণ চলে গেল!‌ এ তো দুর্ঘটনা নয়। খুন!‌

বেলা ১১.‌২৫

প্রচুর কাজ নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলাম। মূলত তিনটে কাজ। অধিকাংশই হল না।

ব্যাঙ্কে গিয়ে মায়ের পেনশনটা তুলে আনার ইচ্ছে ছিল। চেক সই করানোর সময়ই মা বলল, ‘আজ কি ব্যাঙ্ক খোলা? ‌রবীন্দ্রজয়ন্তী তো।’ তাই? ‌রবীন্দ্রজয়ন্তীতে ব্যাঙ্ক ছুটি থাকে?‌ এটা তো জানা ছিল না। বিশ্বাস হল না। মনে হল, গিয়ে দেখি। রাস্তা তো ফাঁকাই আছে। বন্ধ থাকলে চলে আসব। খুব সময় নষ্ট হবে না। গিয়ে দেখলাম শাটার ফেলা রয়েছে। ব্যাঙ্ক সত্যিই বন্ধ। সত্যি, এখনও কতকিছু জানি না।

পরের স্টপ:‌ জিডি মার্কেট। লকডাউন ডায়েরি লিখতে লিখতে কলমের কালি ফুরিয়ে গিয়েছে। আসলে এতদিন টানা এতখানি করে তো কলমে লেখা হয় না। ফিল্ডে গিয়ে নোট নেওয়া তো কবে চুকে গিয়েছে। এখন কলমের ব্যবহার শুধু বিভিন্ন ধরনের দরখাস্ত সই করতে। কিন্তু এবার কালি ফুরোচ্ছে দ্রুত। রিফিল দরকার। মুশকিল হল, বিশেষ ধরনের রিফিল ছাড়া আবার লিখতে পারি না। সেই বিলাসিতাটা এখনও ছাড়তে পারিনি। হয়তো এবার ছাড়তে হবে। কারণ, রিফিল পাওয়া গেল না। কবে আসবে, তা–ও জানতে পারলাম না। ধুস!‌

মার্কেটে রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং তৎসহ মুখ্যমন্ত্রীর করোনা সংক্রান্ত সতর্কীকরণ চালানো হয়েছে। সঙ্গে ইন্দ্রনীলের করোনা নিয়ে ভরাটগলার গান গমগম করছে। এটাই কি সরকারি নির্দেশ হিসেবে দেওয়া হয়েছিল কাল?‌ যে রবীন্দ্রজয়ন্তীতে সকাল ৯টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত রবীন্দ্রসঙ্গীত এবং মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য বাজাতে হবে। বিভিন্ন জায়গায় ট্যাবলো নিয়ে গিয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করতে হবে। যা নিয়ে বিরোধীরা কিছু নিস্ফল হল্লা করেছে।

জিডি মার্কেটে বিপ্লবের সঙ্গে দেখা হল। মুখ চুন করে বসে আছে। বলল, গতকাল থেকে দোকান খুলছে। কিন্তু কাজ নেই। কারিগরও নেই। বিপ্লবের দুই সন্তান। দ্বিতীয়টির আবার স্রেফ কয়েক মাস বয়স। কী যে হবে! ভাল লাগে না। ‌ওর কাছে অনেকদিন আগে একটা শার্ট দিয়েছিলাম অল্টার করাতে। হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে হবে বলেও মনে হয় না। শার্টটা খানিক খোঁজাখুঁজি করালাম বিপ্লবকে দিয়ে। পাওয়া গেল না। কোথায় কাপড়ের পাহাড়ে ঢুকে বসে আছে।

সবিতা’দির টাকাটা দেওয়া বাকি ছিল। লকডাউনের জন্য আসতে পারছে না। আজ অবশেষে আমিই গিয়ে দিয়ে এলাম। এই একটা কাজ সাসসেসফুলি হল অ্যাটলিস্ট।

দুপুর ১২.‌২৫

বিক্রম সিং খাঙ্গুরার গান শুনতে শুনতে ওয়ার্কআউট করলাম। বিনা যন্ত্রানুষঙ্গে। কালোয়াতি বুঝি না। গিটকিরি বুঝি না। উচ্চাঙ্গ বুঝি না। কানে যেটা লাগে, সেটাই আমার কাছে গান। অকালপ্রয়াত বিক্রমের রবীন্দ্রসঙ্গীত খালি গলায় আমার কানে বেশ লাগে। লেগেছিল। সে গানের ব্যাকরণ বা গায়কি বিচার করার যোগ্যতা বা ধৃষ্টতা আমার নেই। কোনওদিন হবেও না। কিন্তু কোনও কোনও গলা আমায় পেড়ে ফেলে। যেমন আজ ফেলল। বিক্রমের গলা।

অনেক বছর আগে এক সন্ধ্যায় মায়ের সঙ্গে বিধাননগর মেলার পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। মাইকে ভেসে এল, ‘ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি, বনের পথে যেতে’। অত বলিষ্ঠ নারীকণ্ঠে ওই লাইনগুলো আগে শুনিনি। কী যেন একটা ছিল গলায়। মায়ের হাত ধরে টানতে টানতে মেলার মাঠে ঢুকে পড়লাম। মঞ্চের সামনে গিয়ে দেখলাম, একটি মেয়ে দাপিয়ে গাইছে। সেই আমার প্রথম শোনা লোপামুদ্রা মিত্রকে। ওর গলা সম্পর্কে তখন যা মনে হয়েছিল, এখনও তা–ই মনে হয়— বলিষ্ঠ।

গানের সঙ্গে যন্ত্রানুষঙ্গও মন দিয়ে শোনা আমার অভ্যাস। দুটো পরস্পরের কমপ্লিমেন্টরি তো। ইন ফ্যাক্ট, গানের মতোই আমার কানে লেগে থাকে মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট। ইদানীংকালে আমার সবচেয়ে পছন্দ জয়ের মিউজিক অ্যারেঞ্জমেন্ট। দারুণ লাগে। মাসপাঁচেক আগে একটা নেমন্তন্ন বাড়িতে জয়কে সামনে পেয়ে বলেও ফেললাম, ‘নিশীথে’ অ্যালবামটায় তোমার অ্যারেঞ্জমেন্ট শুনে ব্যাপক লেগেছিল। কিন্তু সিডি–টা কোথাও পাইনি। বোধহয় ওটা এখন আর বাজারে পাওয়াও যায় না। তুমি কি ওটা পাঠাতে পারো কোনওভাবে?‌

জয় সরকার মানুষ ভাল। সঙ্গে সঙ্গে ই–মেল আইডি নিয়ে নিল। বলল, পুরো অ্যালবামটাই মেল করে দেবে। এখনও আসেনি মেল। নিশ্চয়ই লকডাউনে আটকে আছে কোথাও না কোথাও। এসে পড়বে।

দুপর ১২.‌৪০

বিছানায় বসে বসে যখন এই এন্ট্রি লিখছি, তখন মাথা আর কপাল থেকে টপটপ করে ঝরে পড়ছে পরিশ্রমের স্বেদবিন্দু। এই খাটুনিটা আমার ভাল লাগে। এই খাটুনিটা আমায় কনফিডেন্স দেয়— লড়ে যাব।

এইমাত্র দেখলাম, স্নিকার্সের সোলের কিছু পেস্টিং খুলে গিয়েছে। বিস্কুটের টুকরোর মতো কয়েকটা খসেও পড়েছে। আগে হলে ভাবতাম, কবে এই জুতোজোড়া জামির লেনের ভারত সেবাশ্রম সঙ্ঘে গিয়ে দান করে নতুন একজোড়া কিনব। এখন ভাবছি, কুইকফিক্স বা ডেনড্রাইট কিনতে হবে। সোলটা জুড়ে নিলেই তো দিব্যি কাজ চলে যায়। নতুন জুতো কিনে টাকা নষ্ট করব কেন খামোখা? ‌এসব ছোটখাট ঘটনা ঘটলে আমার ভাল লাগে। এসব ছোটখাট ঘটনা আমায় জ্ঞান দিয়ে যায়— চাইলেই মিনিম্যালিস্ট জীবন বাঁচা যায়। জীবন থেকে ছেঁটে ফেলা যায় অপ্রয়োজনীয় আর বাড়তি চাহিদা।

‌দুপুর ১২.‌৪৫

গুরুজন, মহাজ্ঞানী এবং হিতৈষীদের পরামর্শ মেনে কোলবালিশটা রোদে দিলাম। কারণ, কলারবোনটা এখনও একটু টাটাচ্ছে।

দুপুর ১.‌৫০

আজ আবার গিয়েছিলাম জগদীশের কাছে। ওর হাতে লেখা বন্ধুর নামের উল্কিটার ফয়সালা করতে হতো।

ফয়সালা হল। ছোট্টবেলায় দুই বন্ধু একে অপরের হাতে পরস্পরের নাম উল্কি করিয়েছিল। ইয়ে দোস্তি হাম নহি তোড়েঙ্গে টাইপ। জগদীশের হাতে লেখা —কমল’। কমলের হাতে ‘জগদীশ’। তখন দু’জনই থাকত দক্ষিণ বারাসতে। একসঙ্গেই বড় হওয়া। কিন্তু কমলের পরিবার অবস্থাপন্ন। জমিজিরেত আছে। সেখানে চাষবাস হয় ভালই। জগদীশ গরিব। তার জমিও নেই। ফলে তাকে রোজগারের ধান্দায় আসতে হয়েছে শহরে। স্ত্রী এবং দুই পুত্রকন্যাকে নিয়ে শহরে বাড়িভাড়া করে থাকে সে। কমল থাকে গ্রামের বাড়িতে। কিন্তু রোজ দুই বন্ধুর ফোনে কথা হয় দু–তিনবার।

ডালায় ফল সাজিয়ে বিক্রি করে ক্ষুন্নিবৃত্তি করে জগদীশ। বন্ধু কমল জোতদার। এই কঠিন জীবন না বেছে নিয়ে বন্ধুর কাছে সাহায্য চাইলেই তো হতো?‌

ফল ওজন করতে করতে মাস্কের আড়ালে হাসল ছোটখাট চেহারার যুবক, ‘ওর কাছে টাকার সাহায্য চাইলে কি আর বন্ধুত্বটা থাকত?‌ তার চেয়ে এটাই ভাল। ও ওর মতো থাকে। আমি আমার মতো। দু’জনে সুখদুঃখের কথা বলি। বন্ধুত্বের মধ্যে টাকাপয়সা ঢোকালে সেটা কি আর বন্ধুত্ব থাকে?‌ বলুন?’

দু’পাশে মাথা নাড়লাম। থাকে না। যতদিন বাঁচি, ততদিন শিখি।

‌বিকেল ৪.‌১৭

রবীন্দ্রসদনের সামনের রাস্তায় টেবিলের উপর রবি ঠাকুরের পেল্লায় ছবি বসানো হয়েছে। রবি ছবির মাথায় ইয়াব্বড় গার্ডেন আমব্রেলা। নীল–সাদা ডোরাকাটা। সেই ছাতার সঙ্গেই টেবিলের উপরে পাতা সাদা চাদরও বৈশাখ অপরাহ্নের তপ্ত হাওয়ায় পতপত করে উড়ছে।

রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে মুখ্যমন্ত্রীকে বেশ কিছুদিন পর আর আবার প্রকাশ্যে দেখা গেল। সঙ্গে মন্ত্রী ইন্দ্রনীল। মুখ্যমন্ত্রী প্রথমে রবীন্দ্রসদনের চত্বরে গিয়ে পূর্ণাবয়ব মূর্তির পাদদেশে ফুলের শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করলেন। তারপর বাইরের ছবিতে। বাকিরাও পুষ্পার্ঘ্য দিলেন। মন্ত্রী, আমলা, পুলিশ। অতঃপর মুখ্যমন্ত্রী একটি নাতিদীর্ঘ ভাষণ দিলেন। বললেন, লকডাউনের জন্য এভাবেই রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন করতে হচ্ছে এ বছর। তারপর তিনি এবং ইন্দ্রনীল দ্বৈতকণ্ঠে গাইলেন, ‘দাঁড়িয়ে আছো তুমি আমার গানের ওপারে’।

অনুসন্ধিৎসু চোখ দেখল, মুখ্যমন্ত্রীর অনতিদূরে দাঁড়িয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। কর্ডলেস মাইক্রোফোন হাতে অনুষ্ঠানটি কার্যত পরিচালনাও করলেন তিনিই। মুখ্যসচিব রাজীব সিন্‌হাকে আজও কোথাও দেখা গেল না। ব্যাপারটা ক্রমশ আরও ইন্টারেস্টিং হচ্ছে।

রাত ৯.‌৩৫

সকাল থেকে দিনভর সোশ্যাল মিডিয়ায় যা রবি ঠাকুর খেলাম, তাতে এখন চোঁয়া ঢেকুর উঠছে। দ্রুত অ্যান্টাসিড দরকার। দেখি টুইটারে কিছু ফান ভিডিও পাওয়া যায় কিনা।

রাত ১০.‌১৬

মজার ভিডিও খুঁজতে গিয়ে টুইটারে ঔরঙ্গাবাদের রেললাইনটার কয়েকটা ছবি চোখে পড়ে গেল। লাইনের উপর ছড়ানো কয়েকটা পোড়া অথচ অক্ষত হাতরুটি, কিছু দলামোচড়া মলিন জামাকাপড়, কয়েকটা সস্তাদরের মাস্ক, হাওয়াই চপ্পল, নাইলনের থলে, তেলের শিশি। ওঁরা যা যা চেয়েছিলেন, সব দিয়েছে রাষ্ট্র। একটা ট্রেনও।

কী কিউট!‌ না? ‌

লকডাউন ডায়েরি – ৭ মে, ২০২০

০৭.‌০৫.‌২০২০। বৃহস্পতিবার

বেলা ১১.‌১৭

বিশাখাপত্তনমের কারখানা থেকে গ্যাস লিক করে হাজারের উপর মানুষ অসুস্থ। মৃত্যু হয়েছে একটি শিশু–সহ ১১ জনের। হাসপাতালে ভর্তি শতাধিক। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৮০ জন সঙ্কটজনক। সকাল থেকে টিভি খুলিনি। ভাল লাগছিল না। ঠিকই করেছিলাম। খুলেই তো এই খবর!‌ খারাপ লাগাটা আরও বেড়ে গেল। আর একলহমায় এসে ধাক্কা মারল ওই ৩৬ বছর আগের ছবিটা। যেমন কোথাও গ্যাস লিকের খবর পেলেই ধক করে এসে বুকে লাগে।

এবড়ো খেবড়ো কাদামাটির স্তূপের মধ্যে শুয়ে এক নিথর শিশু। শুধু মুখটুকু বেরিয়ে। বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতায়, শ্বাসকষ্টে নীল হয়ে গিয়েছে দুটো খোলা চোখের মণি। শিশুটির মাথায় একটি পুরুষালি হাত। বোধহয় সেই হতভাগ্যের কোনও আত্মীয়ের। নাকি তার বাবারই। কে জানে!‌ তখনও এই পেশায় আসিনি। কিন্তু ছবিটা চিরকালীন স্মৃতিতে থেকে গিয়েছে। আইকনিক। পৃথিবীর যেখানেই গ্যাস দুর্ঘটনা ঘটুক, ছবিটা হেঁটে এসে হাজির হয়। তারপর ধাওয়া করতে থাকে। করতেই থাকে। যেমন এখন করছে।

প্রায় কাছাকাছির একটা দৃশ্য চোখে দেখেছিলাম। ২০০৪ সালে সুনামির পর তামিলনাড়ুর নাগাপট্টিনম মৎস্যবন্দরে। ঢেউয়ের ঝাপটে চারতলা, তিনতলা, পাঁচতলা, ছ’তলা ট্রলারের স্তূপ। একটা আরেকটার উপর উঠে গিয়েছে। ঠিক বহুতল বাড়ির মতো। ঘটনার তিনদিন পরেও সেগুলোর খাঁজখোঁজ থেকে ঝুলছে মৃতদেহ। রাইগর মর্টিস ধরে শক্ত হয়ে গিয়েছে। করাত দিয়ে কেটে কেটে বার করে লাদাই করা হচ্ছে ট্রাকে।

কত লোক মারা গিয়েছিলেন?‌ বেসরকারি হিসেবে শুধু নাগাপট্টিনমেই আট হাজার। একটা শহর কয়েক মিনিটে ছারখার হয়ে গিয়েছিল। সারা রাত গাড়িতে ট্রাভেল করে যখন ভোরবেলায় গিয়ে পৌঁছলাম, চারদিকে মৃত্যুর আঁশটে গন্ধ। টন টন ব্লিচিং পাউডারও সেই গন্ধ চাপা দিতে পারেনি।

সারাদিন কাটিয়ে বিকেলে যখন ফিরছি চেন্নাইয়ের পথে, তখন শহরের উপান্তে এক মাঠে গণকবর খুঁড়ে গোর দেওয়া হচ্ছে নিহতদের। সেই মাঠের চারপাশে একটানা চাপা গোঙানির মতো কান্না এখনও মনে মনে কান পাতলে শুনতে পাই। শুনতে পাই, কীভাবে চাপা আওয়াজটা আস্তে আস্তে চৌদুনে উঠে সমবেত হাহাকার হয়ে আছড়ে পড়ল চরাচরে। সেই বুকফাটা আর্তনাদের মধ্যে কবরে শোওয়ানো নিথর শিশুর কপালে তার বাবা এঁকে দিচ্ছিলেন স্নেহচুম্বন। ঝুঁকে পড়ে সন্তানের মুখে বুলিয়ে দিচ্ছিলেন পাউডারের পাফ। শেষযাত্রার সাজ। পরম যত্নে পকেট থেকে ক্যাডবেরির প্যাকেট বার করে রেখে দিচ্ছিলেন শিশুদেহের পাশে।

আদিগন্ত বিস্তৃত সেই শোকভূমিতে শুধুমাত্র ওই একটি লোকের চোখে জল ছিল না। পাথরের মতো চেহারাটার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গিয়েও কথা বলতে পারিনি। মনে হয়েছিল, ওই তো তাসের ঘর। টোকা দিলে যদি হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে!‌

আজ বিশাখাপত্তনমের কারখানা থেকে বেরিয়ে আসা ঝাঁঝালো গ্যাসে শিশুমৃত্যুর ঘটনায় আবার ফিরে এল ছবিগুলো।

টিভি–তে দেখছি, অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলে রওনা হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী জরুরি বৈঠক ডেকেছেন। সেখানে আছেন অমিত শাহ এবং রাজনাথ সিংহ। করোনার জন্য মজুত ভেন্টিলেটর লাগানো হয়েছে শ্বাসকষ্টে ভুগতে–থাকা অসুস্থদের রিলিফ দিতে। সকলকে বলা হয়েছে মাস্ক জলে ভিজিয়ে মুখে পরতে। নিহতদের পরিবারকে ১ কোটি টাকা করে অর্থসাহায্য ঘোষণা করেছে রাজ্য সরকার। কারখানা থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরত্ব পর্যন্ত ছড়িয়েছে গ্যাস। তিনটে গ্রাম খালি করা হয়েছে। কিন্তু অভিঘাত তো থাকবেই। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অসুস্থ এবং নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। এসব ঘটনায় মৃত্যু কম ট্যাক্স চাপায় না।

বেলা ১১.‌৩৪

আজ ঘুম থেকে ওঠা ইস্তক ডানদিকের কলারবোনে একটা টান লাগছে। সম্ভবত শোওয়ার দোষে। বই পড়ার জন্য মাথাটা উঁচু রাখতে হয় বলে এমনি বালিশের বদলে কোলবালিশ মাথায় দিয়ে শুই। সম্ভবত বেকায়দায় টান লেগেছে। অনেকে বলে, বালিশ ছাড়া ঘুমোন উচিত। সেটাই স্বাস্থ্যকর। কিন্তু চেষ্টা করেও পারিনি। অত কৃচ্ছ্রসাধন করতে পারলে তো সন্ন্যাসীই হতাম।

বেলা ১১.‌৪৫

আজ বুদ্ধপূর্ণিমা উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী জাতির উদ্দেশে বার্তা দিয়েছেন। বলেছেন, ‘সারা দেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশে দাঁড়ান। এই সঙ্কটকালে গোটা পৃথিবী ভারতকে স্মরণ করেছে। এবং মানবতার প্রশ্নে ভারত সারা পৃথিবীর পাশে দাঁড়িয়েছে।’

বিন্দুমাত্র দেরি না করে তৃণমূল সাংসদ দীনেশ ত্রিবেদী টুইট করেছেন, ‘বুদ্ধপূর্ণিমায় কি দেশের গরিব মানুষদের জন্য কোনও বার্তা আছে?‌ এটাই কি মানবিকতা?‌’

দুপুর ১২.‌৩০

গুবলু, গুবলু, গুবলু। বিগ গুবলু।

গুবলুর কেন্দ্রে কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক বসানোর ব্যাপারে রাজ্য সরকারের বিজ্ঞপ্তি। গুবলুর রচয়িতা রাজ্যপাল। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক বসানো হচ্ছে। সেই মর্মে গতকালই বিজ্ঞপ্তি বেরিয়েছে। তাতে বেজায় ক্ষুব্ধ রাজ্যপাল। তিনি সকাল সকাল টুইট করেছেন মুখ্যসচিবের উদ্দেশে। বলেছেন, বিজ্ঞপ্তি দেওয়ার আগে তাঁর সঙ্গে কোনও আলোচনাই করা হয়নি। তাঁর কাছে সেই মর্মে কোনও খবরও ছিল না। অথচ, মিডিয়ার হাতে হাতে বিজ্ঞপ্তি ঘুরছে। এটা হতে পারে না। অবিলম্বে যেন বিজ্ঞপ্তিটি রাজভবনে পাঠানো হয়।

দ্বিতীয়ত, ওই বিজ্ঞপ্তি খারিজ করার আবেদন জানিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে পিটিশন করেছেন উত্তর কলকাতার এক বাসিন্দা। তিনি জানাচ্ছেন, এই আপৎকালীন পরিস্থিতিতে হাইকোর্ট আবেদনের শুনানি দ্রুত না করতে পারলে তিনি সুপ্রিম কোর্টে যেতেও তৈরি। তবে শোনা যাচ্ছে, হাইকোর্টে আগামী সপ্তাহে শুনানি হতে পারে।

তৃণমূলের সাংসদ সৌগত রায় অবশ্য সাফ জানিয়েছেন, রাজ্যপালের জন্যই অর্ডিন্যান্স না এনে বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘প্রশ্ন হল, এর জন্য রাজ্যপালের অনুমতি লাগে কি লাগে না?‌ উত্তর হল:‌ না। লাগে না। সরকার অর্ডিন্যান্স এনে করতেই পারত। কিন্তু যেখানে জগদীপ ধনকড়ের মতো রাজ্যপাল আছেন, সেখানে সরকার অর্ডিন্যান্স না এনে পুর আইন দেখে, বিচার বিবেচনা করে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছে।’ ঠিকই। অর্ডিন্যান্স আনলে তো আবার সেটা রাজভবন থেকে সই করিয়ে আনতে হতো। সে সই করার কলম যদি হারিয়ে ‌যায়? রিস্ক তো নেওয়া যায় না।

মনে হচ্ছে গুবলুটা ‘বিগ’ থেকে ‘বিগার’ হতে পারে। দেখা যাক।

দুপুর ১২.‌৪৫

ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, করোনাভাইরাসের আক্রমণ পার্ল হারবার এবং ৯/‌১১ হামলার চেয়েও বিধ্বংসী। মৃতের সংখ্যা ধরলে সেটা ভুলও নয়। এখনও পর্যন্ত আমেরিকায় করোনায় মৃতের সংখ্যা ৭৩ হাজারেরও বেশি। গত ২৪ ঘন্টাতেই মারা গিয়েছেন ২,০৭৩ জন। তবু পার্ল হারবার বা ৯/‌‌১১ হামলার সঙ্গে তুলনা করলে কেমন যেন একটু লাগে। সেটা হয়তো দুটো ঘটনার আকস্মিকতা এবং তাৎক্ষণিক অভিঘাতের জন্য।

পার্ল হারবার হামলার সময় জন্ম হয়নি। ওটা দেখা হলিউডের যুগান্তকারী ছবিতে। তার মধ্যে বীরত্ব, গরিমা, রোমান্স— সব মিলেমিশে একাকার। যুদ্ধের বাস্তবতা সেখানে খানিক ঢাকা পড়েছে সিনেম্যাটিক স্বাধীনতার কাছে। কিন্তু ৯/‌১১ হামলার অকুস্থলটা দেখেছিলাম। ঘটনাটা ঘটেছিল ২০০১ সালে। আমি নিউ ইয়র্কে যাই ২০০৫ সালে। সেই প্রথম। এখনও পর্যন্ত সেই শেষ। গিয়েছিলাম অন্য অ্যাসাইনমেন্টে। কিন্তু ‘মাদার অফ অল ইনসিডেন্ট্‌স’ যেখানে ঘটেছিল সেখানে যাব না, তা তো হতে পারে না।‌ ‌সাবওয়ে ধরে চলে গেলাম ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার স্টেশনে।

এসকালেরটর দিয়ে উপরে উঠে ডানদিকে গেলেই গহ্বরটা। টুইন টাওয়ার যেখানে ভেঙে পড়েছিল। দোতলা সমান উঁচু তারের জালে ঘেরা। একঝলক দেখলে মনে হয়, দাঁত তোলার পর মাড়িতে গভীর খোঁদলের মতো। সেখানে ততদিনে পুনর্নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। প্রাণপণে অতীত ভুলে চারপাশে খুশিয়াল নিউ ইয়র্ক শহর। ছুটছে, খেলছে, দৌড়চ্ছে। তারের জাল ধরে ধরে এগিয়ে গহ্বরের যথাসম্ভব কাছাকাছি গেলাম। জালের অন্যপাশে একটা আয়তাকার ব্ল্যাকবোর্ড। তাতে হামলায় চিরকালীন নিখোঁজদের পরিজনেরা বার্তা লিখে গিয়েছেন। বোর্ডের নীচে শুকনো ফুলের তোড়ার স্তূপ।

মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকিয়ে ঠাহর করার চেষ্টা করলাম— পরপর দুটো প্লেন আকাশ চিরে এসে এসে ঢুকে যাচ্ছে দুটো অতিকায়, গগনচুম্বী টাওয়ারে। আচমকা চারদিক নিঝুম হয়ে গেল। থেমে গেল সমস্ত ছুট, খেলা, দৌড়। মনে হল আগুনের গোলা আর গলিত কংক্রিট নেমে আসছে অন্তরীক্ষ থেকে। চমক লাগল! দৌড়ে বেরিয়ে এলাম ঘেরাটোপ থেকে। ট্রেন ধরে সোজা ডাউনটাউন ম্যানহাটানের হোটেলে।

করোনাভাইরাসের ছোবল এর চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী এবং মারণশীল হতে পারে। কিন্তু দৃশ্যত এবং তাৎক্ষণিক অভিঘাতে এর চেয়েও ভয়াবহ?‌ কে জানে!‌

‌দুপুর ‌‌১.‌০০

আজ শুরু হচ্ছে ‘বন্দে ভারত মিশন’। বিদেশে যেখানে যেখানে ভারতীয়রা লকডাউনে আটকে পড়েছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনার অপারেশন। বিমান এবং যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হচ্ছে বলে জানাচ্ছে টিভি। দুনিয়ার ইতিহাসে এটাই নাকি হতে চলেছে বৃহত্তম ইভ্যাকুয়েশন প্রসেস।

এঁদের কাছে কি বিমান বা জাহাজের ভাড়া নেওয়ার কথা ভাবা হয়েছিল?‌ পরিযায়ী শ্রমিকদের মতো?‌

দুপুর ১.‌৪০

ফেসবুকে অনেকে আজই রবীন্দ্রনাথকে শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন রবীন্দ্রজয়ন্তী উপলক্ষে। লিয়েন্ডার পেজ যেমন ইনস্টাগ্রামে ‘শুভ জন্মদিন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ বলে ভিডিও পোস্ট করেছেন। তাহলে কি আজই পঁচিশে বৈশাখ?‌ ইংরেজি–বাংলা তারিখ একটু গুলিয়ে ফেলি। ফলে চক্ষুকর্ণের বিবাদভঞ্জনে কাগজ খুলে দেখলাম। প্রথম পাতায় মাস্টহেডের নীচে পরিষ্কার লেখা ২৪ বৈশাখ। তাহলে?‌ রবীন্দ্রনাথ কি দু’দিন ধরে জন্মেছিলেন?‌ এটা কি ইংরেজি তারিখ আর বাংলা তারিখের দ্বন্দ্ব?‌ কিন্তু দ্বন্দ্ব কেন হবে?‌ রবীন্দ্রনাথ তো বাঙালিই ছিলেন!‌ নাকি সকলে ‘হ্যাপি বার্থডে ইন অ্যাডভান্স’ করছেন?‌

দুপুর ১.‌৫১

তৃণমূল সাংসদ অপরূপা পোদ্দার কন্যাসন্তানের জননী হয়েছেন। সদ্যোজাতের নাম রাখা হয়েছে ‘করোনা’। অপরূপার স্বামী রিষড়া পুরসভার কাউন্সিলার সাকিব আলি বলেছেন, ‘বিশ্বজুড়ে করোনাভাইরাস যে অশান্তি তৈরি করেছে, এর মধ্যেই আমাদের সন্তান শান্তি বয়ে আনবে। তাই ওর নাম রাখা হয়েছে করোনা।’ তবে করোনা ডাকনাম। পরে ভাল নাম রাখবেন মুখ্যমন্ত্রী। ‘করোনাঞ্জলি’ হলে কেমন হয়?‌

বিকেল ৪.‌১০

আজ এডিট মিটিংয়ের পর অশোক’দা চুনী’দার গল্প বলছিলেন। কী সব অ্যানেকডোট। কী ক্যারিশম্যাটিক চরিত্র। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনতে হয়। ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস— কী খেলেননি!‌ এসব চরিত্র সত্যিই ক্ষণজন্মা। হোয়াট আ প্লেয়ার। অশোক’দা বলছিলেন, ‘চুনীদা ক্যারাম খেললেও চ্যাম্পিয়ন হতো। অল গ্রেট্‌স আর ব্যাড লুজার্‌স।’

বিকেল ৫.‌৪৫

আজ দু’বার দিলীপ ঘোষের মুখে দু’রংয়ের মাস্ক দেখা গেল। দুপুরে দেখেছিলাম কালো জমির উপর পদ্ম রংয়ের পদ্মফুল। এখন আবার দেখছি পদ্ম রংয়ের জমির উপর কালো সুতোর এমব্রয়ডারি করা পদ্ম। দুটো কি আলাদা মাস্ক?‌ নাকি দুপুরেরটাই এখন পরতে গিয়ে উল্টো পরে ফেলেছেন?‌ বোঝা গেল না। কৌতূহল হচ্ছে।

সন্ধ্যা ৬.২০

স্বস্তিকা মুখোপাধ্যায় টুইটারে ‘সহজপাঠ’এর কভার আর প্রথম পাতাটা পোস্ট করে লিখেছেন ‘প্রণাম’। মনে হল, তাঁকে একবার ফোন করে জিজ্ঞাসা করি। মেসেজ পাঠালাম। জবাব এল না। তবে টুইটার থ্রেডে দেখলাম, ইভান অর্ণব গোমস নামে একজন লিখেছেন, ‘রবীন্দ্রজয়ন্তী কালকে। অ্যাট লিস্ট টু অল বেঙ্গলিজ। কাল ২৫শে বৈশাখ।’ স্বস্তিকা জবাবে লিখেছেন, ‘আজকে বললে কি রবি ঠাকুর বকবেন?‌ কালকেও বলব। দু’দিন বললে অসুবিধাটা কোথায়?‌’

সন্ধ্যা ৭.‌১০

রাজ্যে গত ২৪ ঘন্টায় আরও সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত আরও ৯২ জন। এটা কি রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন? ‌নাহ্‌, আজ তিনি আর প্রেসকে ব্রিফ করতে আসেননি। কেন আসেননি বুঝলাম না। যদিও নবান্ন থেকে জানতে পারলাম, গত দু’দিন তাঁকে ব্রিফ করতে পাঠানোটা ছিল সরকারি সিদ্ধান্ত। তাহলে কি তাঁকে আজ না পাঠানোটাও সরকারি সিদ্ধান্ত?‌ স্বরাষ্ট্রসচিব বা অন্য কোনও আমলার অনুপস্থিতিতে আজকের তথ্য দিল স্বাস্থ্যভবনের বুলেটিন।

কাল যা লিখেছিলাম। বুলা’দির লুডো জারি আছে। আজ কলকাতা আবার মইয়ের তলায়। কনটেনমেন্ট জোনের সংখ্যা বেড়েছে।

বড়বাজারের দোকানপাট অন্যত্র সরানোর কথা ভাবা হচ্ছে। গত দু’দিন নাকি ওই এলাকায় সংক্রমণ বেড়েছে। তার কারণ, লকডাউন থাকা সত্ত্বেও ওই ঘিঞ্জি এলাকায় পণ্য নিয়ে বাইরের ট্রাক আসে। সেই বহিরাগত যানবাহন এবং তার চালক–খালাসিদের থেকে সংক্রমণ হতে পারে। এমনই বলেছেন কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম। সেজন্য কলকাতা পুলিশের কাছে প্রস্তাব গিয়েছে, শহরের বাইরে কোথাও তুলনামূলক ফাঁকা জায়গায় বাজারটা সরিয়ে নেওয়ার জন্য। কী যে হবে!‌

এইমসের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, জুন–জুলাই মাসে করোনা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে। সেই ভয়াবহতার পরিমাণ নির্ভর করবে লকডাউনের সাফল্যের উপর। ডায়েরিতে ঠিকই লিখেছিলাম কয়েকদিন আগে— দ্য লাইট অ্যাট দ্য এন্ড অফ দ্য টানেল ইজ অফ আ কামিং ট্রেন!‌

রাত ৮.‌১৫

নিউজ চ্যানেলের জনপ্রিয় শোয়ে অ্যাঙ্কর বলছেন, ভোপালের ওই ছবিটি ছিল একটি পুতুলের। চমৎকার!‌

পুতুল?‌ বিশ্বের ইতিহাসে ভয়াবহতম ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্র্যাজেডিতে চোখের পলকে ২,০০০ মানুষের মৃত্যুর পরদিন যেখানে ভোপাল শহরে সেই দেহগুলি কবর দিতেও জমি পাননি তাঁদের পরিজনেরা, সেখানে একটি পুতুলকে কবর দেওয়া হবে!‌ ওয়াহ্‌!‌

এখানে লেখা থাক, ওই একই ছবির দু’টি ফ্রেম তুলেছিলেন দুই ফটোগ্রাফার। পাবলো বার্থোলেমিউ এবং রঘু রাই। পাবলো তুলেছিলেন রঙিন ছবি। রঘু সাদা–কালো। পাবলোর তোলা ছবিটি ১৯৮৪ সালে ‘ওয়ার্ল্ড প্রেস ফটো অফ দ্য ইয়ার’ হয়েছিল। রঘুর পুত্র নীতিন রাইয়ের সঙ্গে একসময় একই অফিস স্পেসে কাজ করেছি দিল্লিতে। ও ফটোগ্রাফার ছিল ‘সানডে’ ম্যাগাজিনে। আমি আনন্দবাজারের দিল্লি ব্যুরোয়। নীতিনের বিখ্যাত বাবার সঙ্গে একবারই দেখা হয়েছিল ঘটনাচক্রে। তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম ভোপালের ছবিটা নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, কোনওমতে ছ’টা–আটটা ফ্রেম তুলতে পেরেছিলেন। তখন সবে শিশুটির দেহে মাটি দেওয়া হচ্ছে। তার মধ্যেই দ্রুত শাটার টেপা। কারণ, তাঁর কাছে ওই একটি ফ্রেমই ছিল গোটা ট্র্যাজেডির ধারক। আইকনিক। রঘু রাইয়ের চোখ ভুল ভাবেনি।

এখনও মনে আছে, রঘু বলেছিলেন ‘মোস্ট পাওয়ারফুল অ্যান্ড মুভিং মোমেন্ট অফ দ্য ট্র্যাজেডি’। আর বলেছিলেন, ছবিটা তোলার পর পাবলো এবং তিনি— দু’জনেই সেখানে দাঁড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন।

ওটা নাকি পুতুলের ছবি!‌ হাঃ!‌

রাত ১০.‌১৩

কাদামাটির স্তূপে শুয়ে নিথর শিশু। শুধু মুখটুকু বেরিয়ে। বিষাক্ত গ্যাসের তীব্রতায়, শ্বাসকষ্টে নীল দুটো খোলা চোখের মণি।

ও পুতুল ছিল না। ‌

লকডাউন ডায়েরি – ৬ মে, ২০২০

০৬.‌০৫.‌২০২০। বুধবার

ভোর ৪.‌০৪

প্রবল মেঘ ডাকছে। ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ঝাঁকে ঝাঁকে বৃষ্টি এসেছে। বিদ্যুৎ চমকানোর চোটে ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। প্রথমে মনে হল, ঘরের ভিতরটা কেমন আলো আলো হয়ে গেল। অথচ সমস্ত জানালা–দরজা বন্ধ। এটা কী করে হল বুঝতে পারলাম না।

দরজা খুলে বারান্দায় গিয়ে দেখলাম, তোড়ে বৃষ্টি নেমেছে। রেলিংয়ে মেলে দেওয়া সমস্ত জামাকাপড় অসহায়ভাবে ভিজছে। সেগুলো তুললাম। ভেবেছিলাম, একটু বারান্দায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখি। তারপর মনে হল, এর চেয়ে বাকি বিশ্বের মতোই নিদ্রামগন থাকা ভাল। তাই বিছানায় ঝাঁপ দিয়ে পড়েছি।

সকাল ৮.‌২০

আজও অ্যালার্ম–ইগনোরেন্ট হয়ে ঘুম ভাঙল। সকাল ৮টায় অ্যালার্ম দেওয়া থাকে। সেটা যথেষ্ট তীক্ষ্ণ। কানে না আসার মতো নয়। এমনিতেই আমার ঘুম যথেষ্ট পাতলা। অ্যালার্ম শুনতে পাই না, এমন সাধারণত হয় না। কিন্তু আজ হল। খুব দেরি হয়ে গিয়েছে। বুড়োবুড়ি নিশ্চয়ই সকালের চায়ের জন্য বসে আছে। কর্তব্যে ঘোর অন্যায় হল।

সকাল ৮.‌৫৮

লজ্জা লজ্জা মুখ করে বাবা–মা’কে চা দিয়ে এলাম। তাঁরা ক্ষমাশীল। অতএব কিছু বললেন না। এখন দেখছি বৃষ্টিতে চারদিক সকাল সকাল চান–টান করে সেজেগুজে দাঁড়িয়ে আছে। দারুণ লাগছে। ঝলমল করছে চারপাশ। আকাশের রং ঝকঝকে নীল। মেঘমুক্ত। গরমটাও নেই। মৃদুমন্দ বহিতেছে মলয়পবন। বাহ্‌।

কিন্তু একইসঙ্গে আরও একটা কথা মনে হল। আমরা যারা পাকাবাড়িতে থাকি এবং একটা মাপমতো বারান্দার অধিকারী, ভোরবেলা ঝড়বৃষ্টি হলে তাদের রোমান্স জাগে। চিত্ত উচাটন এবং মন উড়ু উড়ু হয়। কিন্তু সেই একই ঝড়বৃষ্টিতে মাঠের শস্য নষ্ট হয়। গ্রামে গ্রামে কাঁচাবাড়ি ভেঙে পড়ে। ঘরের অ্যাসবেস্টসের চাল উড়ে যায়। মাথার আচ্ছাদন হারিয়ে নিরাশ্রয় মানুষ নাঙ্গা, উদোম এবং বেআব্রু হয়ে পড়ে। তখন শুরু হয় তাদের বেঁচে থাকার নতুন লড়াই। করোনা অর নো–করোনা।

সকাল ১০.‌০৪

টিভি বলছে, কলকাতা পুরসভার মুখ্য প্রশাসক হচ্ছেন মেয়র ফিরহাদ হাকিম। তৈরি হচ্ছে ‘বোর্ড অফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটরস্’। সেখানে রয়েছেন মেয়র–সহ আটজন। নেতৃত্বে মেয়র। তাঁর সঙ্গে বোর্ডে তাঁরা, যাঁরা গত পাঁচবছর মেয়র পারিষদ ছিলেন। অর্থাৎ, সেই বোর্ডই ক্ষমতায় রইল। সেই মর্মে সরকারি নির্দেশিকা জারি হবে। অর্থাৎ, কলকাতায় পুরভোট হচ্ছে না। প্রশাসক বসছে। ভোট যে নির্দিষ্ট সময়ে হবে না, সেটা আগেই বোঝা গিয়েছিল। যেমন এটাও জানা আছে যে, ভোট কবে হবে তার কোনও ঠিক নেই। তবে কলকাতা পুরভোটই হল সরকারিভাবে সেই প্রথম গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যার উপর করোনা অভিঘাত পড়ল। এখন এই অভিঘাতটাও করোনার মতোই সংক্রামিত হবে। দেখার যে, আগামী বছর নির্ধারিত বিধানসভা ভোট পর্যন্ত সেটা চলে কিনা। সোজা কথায়, বিধানসভা ভোটও পিছিয়ে যায় কিনা।

অর্ডিন্যান্স না এনে সরাসরি কলকাতা পুরসভায় প্রশাসক নিয়োগ করায় বিরোধীরা হল্লা শুরু করেছে। করবেই। এমনিতে পুরসভার প্রশাসক হিসেবে কোনও আমলাকে নিয়োগ করাই রীতি। এক্ষেত্রে তা হয়নি। সেটাও বিরোধীদের একটা ইস্যু। তবে গণতন্ত্রে সংখ্যাই শেষকথা বলে। এখনও পর্যন্ত।

সকাল ১০.‌৪০

সেরেছে!‌ অভিজিৎ বিনায়কের টুইটার অ্যাকাউন্টটি তাঁর নয়। ফেক। ভুয়ো। তাঁর নামে কেউ ওটা খুলেছে।

ইতিহাসবিদ রামচন্দ্র গুহ টুইটারে ‘আ মেসেজ ফ্রম দ্য ইকনমিস্ট অভিজিৎ ব্যানার্জি’ বলে নোবেলজয়ীকে কোট করে লিখেছেন, ‘আপনি যদি সোশ্যাল মিডিয়ায় থাকেন তাহলে কি এই সত্যিটা লোককে জানাতে পারেন যে, আমায় টুইটারে ইম্পার্সোনেট করা হচ্ছে। আই অ্যাম নট অন টুইটার’।

দ্বিতীয়ত, সুদীপ্তা মেসেঞ্জারে অর্থনীতিবিদ তথা চিত্র পরিচালক সুমন ঘোষের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট পাঠিয়েছে। যেখানে সুমন পরিষ্কার বলেছেন, ওই টুইটার অ্যাকাউন্ট অভিজিতের নয়। ওই হ্যান্ডলে অভিজিৎকে নানারকমভাবে ট্রোলও করা হয়েছে। কিন্তু সবই বিফলে গিয়েছে। কারণ, অ্যাকাউন্টটি নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদের নয়। ফেসবুক পোস্ট বলছে, সুমন এখন ভাবছেন মিস্‌ফায়ার করার জন্য ট্রোলদের মাইনে দেওয়া হবে কিনা। ব্যক্তিগতভাবে আমার ধারনা, রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কথোপকথনের পর কোনও বিশ্বগেঁড়ে এবং অত্যুৎসাহী কংগ্রেসি এটা করে থাকবে।

লকডাউন ডায়েরি ব্লগ এবং ফেসবুকে রোজ আপলোড করার পর খুবই কৃতজ্ঞ লাগে।‌ দেখে আপ্লুত লাগে, যাঁরা পড়েন, তাঁরা কত মন দিয়ে পড়েন। সামান্যতম ভুল হলেই ধরিয়ে দেন। যেমন এই অভিজিতের ফেক টুইটার অ্যাকাউন্টের ব্যাপারটা। প্লাস কোয়েলের সন্তান। কোনওদিনই বিভিন্ন পারিবারিক সম্পর্ক এবং তাদের প্যাঁচ–পয়জার সম্বন্ধে সম্যক জ্ঞান না–থাকায় গতকাল ভুল করে রঞ্জিত মল্লিক এবং তাঁর স্ত্রী–কে কোয়েলের সদ্যোজাত সন্তানের ‘ঠাকুর্দা–ঠাকুমা’ লিখে ফেলেছিলাম। নিমেষে ঝড় উঠে গেল!‌ অধিকাংশই ডায়েরিকারের প্রতি দয়াপরবশ হয়ে ব্যক্তিগতভাবে মেসেঞ্জারে লিখে ভুল ধরিয়ে দিলেন যে, মেয়ের বাবা–মা ‘দাদু–দিদা’ হন। তাঁদের সবিনয়ে ধন্যবাদ জানিয়ে বললাম, শুধরে দিয়েছি। একজন তো সরাসরি ওয়ালেই লিখে বসলেন। তাঁকে ওয়ালেই বললাম, ভুল হয়েছিল। সংশোধন করে দিয়েছি।

অনেকে ভাববেন, এঁরা আসলে হিতৈষী নন। ছিদ্রাণ্বেষী। রোজ ছিপ ফেলে বসে থাকেন। বঁড়শিতে ভুল ধরা পড়লেই টান মেরে তুলে এনে ঝুড়িতে ফেলেন। তারপর সেই ঝুড়ি মাথায় বাজারে বেরিয়ে পড়েন।

আমি তা ভাবি না। উল্টে ভাবি, তাঁরা এই লকডাউন ডায়েরির আত্মীয়। নিজের বলে মনে করেন বলেই চান না যে, কোনওরকম ভুল তথ্য এখানে নথিবদ্ধ থাকুক। নইলে কে কোথায় কী ভুল লিখছে, তা নিয়ে এঁদের কী যায়–আসে! ‌এই ডায়েরি এঁদের প্রত্যেকের কাছে ঋণী। কিছু কিছু ঋণ শোধ করা যায় না। শুধু স্বীকার করা যায়। এই ডায়েরিতেই সেই ঋণ সোচ্চারে স্বীকার করা রইল।

বেলা ১১.‌১২

আজকাল ওয়ার্কআউটের টাইমটা পিছিয়ে দিয়েছি। সাড়ে ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা। তারপর দ্রুত স্নান করে বাবা–মা’কে ১টার মধ্যে খেতে দেওয়া। ফলে মাঝখানের সময়টা ফাঁকা পড়ে থাকছে হাবিজাবি চিন্তা এবং বোধিজ্ঞান উন্মেষের জন্য—

১.‌ যে লোক সবসময় সবকিছু ঠিকঠাক রাখতে চায়, কাউকে চটাতে চায় না, সকলকে ফুল–বেলপাতা দিয়ে তুষ্ট রাখতে চায়, ভাবে আই শ্যাল নট রক দ্য বোট, তারা আসলে লিডার হতে পারে না। তারা শেষে গোলমালে পড়ে। নেতাকে এসপার–ওসপার করার মানসিকতা রাখতে হয়। আ লিডার শুড নট বি স্কেয়ার্ড টু রক আ বোট। তার মধ্যে এই বিশ্বাসটা থাকতে হয় যে, নৌকা উল্টোলে দরকারে নিজে জলে ঝাঁপ দিয়ে সকলকে উদ্ধার করতে পারব।

‘ইন্ডিয়া টুডে’ থেকে নিয়ে আসার সময় প্রথম মিটিংয়ে অভীকবাবু বলেছিলেন, ‘তোমায় যা দায়িত্ব দিচ্ছি, ছ’মাসের মধ্যে ইউ ইউল বি দ্য মোস্ট আনপপুলার বস্‌ ইন দিস ইনস্টিটিউশন!‌’ সবিনয়ে আনন্দবাজারের প্রধান সম্পাদককে বলেছিলাম, আই অ্যাম নট বদার্ড অ্যাবাউট মাই পপুলারিটি চার্ট। কারণ, আমি কখনও প্রেস ক্লাবের ভোটে লড়ব না। আই উইল জাস্ট ট্রাই টু বি ফেয়ার টু এভরিওয়ান টু দ্য বেস্ট অফ মাই এবিলিটি। ব্যক্তিগত পছন্দ–অপছন্দ আমার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে না। করবেও না। কিঞ্চিৎ শ্লাঘার সঙ্গে লেখা থাক, এখনও করে না।

২.‌ যে নিজে অপ্রতিরোধ্য, একমাত্র সেই–ই নিজেকে প্রতিরোধ করতে পারে। থামাতে পারে। নিজের অজান্তেই সে নিজেকে ধ্বংস করার অ্যান্টিডোট তৈরি করে। গৌরবার্থে ভাবলে ইচ্ছামৃত্যু। আবার অন্যদিক থেকে ভাবলে ক্ষমতাসীনের মদমত্ততা। যা তাকে গোকুলে ক্রমবর্ধমান প্রতিষেধকের অস্তিত্ব সম্পর্কে অনবহিত রাখে।

৩.‌ সবচেয়ে বড় নির্বুদ্ধিতা হল বিপক্ষকে দুর্বল মনে করা। সে বিপক্ষ করোনাই হোক বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ।

৪.‌ সারাক্ষণ নেগেটিভিটিকে এড়িয়ে যাওয়াও এক ধরনের নেগেটিভিটি।

বেলা ১১.‌১৭

কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদলের সঙ্গে থাকা ৬ জন বিএসএফ জওয়ানের দেহে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়েছে। ওদিকে কলকাতা পুলিশেও আক্রান্ত হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এটা গভীর চিন্তার বিষয়। নিরাপত্তাবাহিনীর সদস্যরাই যদি আক্রান্ত হতে থাকেন, তাহলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করবে কারা?‌ যদি একের পর এক থানা বন্ধ করে দিতে হয় সংক্রমণের আশঙ্কায়, তাহলে তো রাজ্যটা শাসনহীন হয়ে পড়বে!‌

দুপুর ১২.‌৪৫

অবশেষে আজ বাবা–মা’কে একটু চিকেন খাওয়াতে পারলাম। কাল রাতেই ভেজে রেখেছিলাম। অফিসে বেরোনর আগে একটু মরিচ, ভিনিগার আর নুন দিয়ে ফ্রিজে ম্যারিনেট করতে দিয়ে গিয়েছিলাম। রাতে ফেরার পর মন দিয়ে ভাজলাম।

প্রথম এক্সপেরিমেন্টের দিন পেঁয়াজটা মাংসের সঙ্গে ভাজায় পুড়ে ঘন্ট পাকিয়ে গিয়েছিল। সেটা থেকে শিক্ষা নিয়ে গুবলেট এড়াতে কাল পেঁয়াজটা আলাদা করে ভেজেছি। তারপর মাংসটা ভাজলাম। অল্প ভাপে সেদ্ধও করলাম। তারপর পেঁয়াজভাজাটা মাংসের সঙ্গে মিশিয়ে সন্তর্পণে সেই তণ্বী, কৃষ্ণাঙ্গী বোতল থেকে একটু সয়া সস ঢেলে দিলাম। নামানোর আগে সামান্য মধু। ওয়াহ্‌!‌

রান্নার পর খুন্তি এবং হাতাটা চাটতে চাটতে মনে হয়েছিল, ঠিকই আছে। দিব্য হয়েছে। নুন–টুনও ঠিকঠাক।

তা–ও একটু টেনশনে ছিলাম। কিন্তু আজ বাবা–মা’কে খেতে দেওয়ার সময় ওদের মুখে যে তৃপ্তি দেখলাম, সেটাতেই আমার ভুবনজয় হয়ে গিয়েছে। পাশাপাশি, মাসমাইনে দাবি করার কেসটা আরও জোরাল হল। হা–হা–হা।

দুপুর ২.‌৪৫

বিকল্প আয়ের লাইন খুলে গিয়েছে। মদের দোকানে অন্যের বদলে লাইন দিয়ে মানুষ টাকা রোজগার করছে। জনপ্রতি ১০০ টাকা। অন্তত ফেসবুকে অভিজ্ঞের যা পোস্ট দেখলাম। এটাও এখন একটা প্রফেশন। ‘বাবু’রা রোদের মধ্যে লাইনে দাঁড়ানোর পরিশ্রম করছেন না। তার বদলে ১০০ টাকা দিয়ে সেই পরিশ্রমটা বিক্রি করে দিচ্ছেন এলাকার ছুটকো মানুষের কাছে। তাঁদের খাটুনি বাঁচছে। ঘরে বসে মদ পাচ্ছেন। আবার গরিব মানুষেরও দুটো পয়সা আয় হচ্ছে। এই–ই হল মাইক্রো পর্যায়ে বিকল্প অর্থনীতি। আর এই হল মানুষের দম। নিজের জীবিকা নিজেই খুঁজে নিয়ে যে অসমযুদ্ধেও বেঁচে থাকে।

দুপুর ৩.‌৫০

ওরেব্বাস!‌ কেন্দ্রীয় সরকারও নাকি এবার কো–মর্বিডিটির তত্ত্ব আওড়াতে শুরু করেছে। যে কো–মর্বিডিটি নিয়ে চারদিকে এত আলোচনা, এত রাজনীতির চাপানউতোর। তারপর এই?‌ এ তো দেখা যাচ্ছে, আবার পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পথে হাঁটছে কেন্দ্র। মহামতি গোখলে নিশ্চয়ই মহাখুশি। হোয়াট বেঙ্গল থিঙ্ক্‌স টুডে ইত্যাদি।

বিকেল ৪.‌০৫

আজও প্রেসকে ব্রিফ করছে আলাপন’দা। মুখ্যসচিবকে এখনও দেখা যাচ্ছে না। বস্তুত, মুখ্যমন্ত্রী প্রেসকে ব্রিফ করেছিলেন সম্ভবত ২৯ এপ্রিল। তারপর তিনিও আর সাংবাদিক বৈঠক করেননি। মাঝেমধ্যে টুইট করেছেন এবং ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন। যেমন আজ টুইট করে জানিয়েছেন, কাল থেকে মেডিক্যাল কলেজ পূর্ণাঙ্গ ‘কোভিড হাসপাতাল’ হিসেবে কাজ শুরু করবে।

নবান্নে আলাপন’দা জানাচ্ছে, রাজ্যে নতুন করে করোনা–আক্রান্ত হয়েছেন ১১২ জন। মোট করোনা–আক্রান্ত ১,৪৫৬ জন। গত ২৪ ঘন্টায় আরও চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আর ২৭,৫৭১ জনের নমুনা পরীক্ষা হয়েছে।

ভারত–বাংলাদেশ সীমান্তের পেট্রোপোলে গত কয়েকদিন ধরে একটা হুজ্জুতি চলছিল। কেন্দ্রীয় সরকার তাদের না–জানিয়ে সীমান্ত বাণিজ্য শুরু করে দেওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়েছিল রাজ্য সরকার। পরদিন থেকেই সেখানে বিক্ষোভ শুরু করেন একদল লোক। তাঁদের বক্তব্য, কাস্টমস অফিসাররা বাইরে থেকে আসায় সংক্রমণের সম্ভাবনা থেকে যাচ্ছে। আদান–প্রদান কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চিঠি লিখে বলেন অবিলম্বে গোলমাল মেটাতে। কারণ, দু’দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কের কিছু বাধ্যবাধকতা আছে। বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত বাণিজ্য চালু করাতেই হবে। তাছাড়াও, লকডাউন চললেও কেন্দ্রীয় সরকার পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলের নির্দেশ দিয়েছে। সেই নির্দেশ মানতে হবে।

সেই চিঠিটা নিয়ে আলাপন’দাকে বারবার গ্রিল করার চেষ্টা করল সংবাদমাধ্যম। কিন্তু স্বরাষ্ট্রসচিবের ডিফেন্স অটুট। ব্যাট–প্যাডের মধ্যে আলো গলার ফাঁকও নেই।

এই না হলে শীর্ষস্তরের আমলা!‌

বিকেল ৫.‌৩০

অফিসে আমার চা খাওয়ার দুটো মাগ আছে। একটা কুচকুচে কালো। আরেকটা ট্রান্সপারেন্ট। ট্রান্সপারেন্টটা গত দু’দিন ধরে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। মনটা হাল্কা খারাপ ছিল। ওই মাগটায় লিকার চা ঢাললে দেখতে চমৎকার লাগত। কতটা চা বাকি আছে, সেটাও বোঝা যেত। কালও পীতাম্বরকে খুঁজতে বলেছিলাম। পাওয়া যায়নি। কিন্তু আজ একটু আগে শুভেন্দু ম্যাজিকের মতো মাগটা বার করে দিল!‌ রবিবার চা খেতে খেতে ভুলে গিয়ে বারান্দায় ফেলে এসেছিলাম। রাতে শুভেন্দু দেখতে পেয়ে লকারে তুলে রেখেছিল।

ভগবান শুভেন্দুর মঙ্গল করুন। ওর সোনার মাগ হোক।

বিকেল ৫.‌৫০

কলকাতায় কনটেনমেন্ট জোনের সংখ্যা বেড়েছে। বেড়েছে দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও। ১ থেকে একলাফে বেড়ে ২২। উত্তর ২৪ পরগনাতেও জোনের সংখ্যা বেড়েছে। আবার হাওড়া আর নদিয়ায় বাড়েনি। যা বুঝতে পারছি, এই সংখ্যাটা প্রতিদিন ওঠানামা করতে থাকবে। সাপলুডোর স্কোরের মতো। কখনও মইয়ের নীচে। কখনও সাপের মুখে। শুধু রিভার্স অর্ডারে। এখানে সাপের মুখে পড়লে ভাল। কমে যাওয়া। আর মইয়ের তলায় পৌঁছলে একেবারে ধাঁ করে উপরে।

শুধু ভাবছি, বুলা’দি এই রিভার্স লুডোটা বুঝতে পারবে তো?‌

সন্ধ্যা ৭.‌০০

দিলীপ ঘোষ, সোশ্যাল মিডিয়া যাঁকে আদর করে ‘দিলুদা’ বলে, একেবারে ফাটিয়ে দিয়েছেন। সাংবাদিক বৈঠকে ক্যামেরার সামনে আসছেন পদ্মফুল প্রতীক আঁকা মাস্ক পরে। এটা কিন্তু এখনও কেউ করতে পারেনি। ভাবা যায়, পার্থ চট্টোপাধ্যায় জোড়াফুল আঁকা মাস্ক পরে বা সূর্যকান্ত মিশ্র কাস্তে–হাতুড়ি আঁকা মাস্ক পরে সাংবাদিক বৈঠক করছেন?‌ ব্যাকব্রাশ করা সল্ট অ্যান্ড পেপার চুল, চোখে ফিনফিনে চশমা, কালো টি–শার্ট, মুখে সবুজ মাস্কের উপর হলদে রংয়ের পদ্মফুল— হ্যান্ডসাম লাগছিল দিলুদাকে।

আবার একটা রিভার্স লুডো শুরু হল। যেখানে মইয়ে উঠলে বিপদ এবং রাজ্য সরকার মইয়ে উঠে নম্বর বাড়িয়েছে। অন্তত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবের চিঠি তেমনই বলছে।

কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল রাজ্য ছাড়ার আগে মুখ্যসচিবকে যে চিঠি দিয়ে গিয়েছিল, তাতে বলা হয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে করোনায় মৃত্যুর হার ১২.‌৮ শতাংশ। গোটা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। তারা ফিরে গিয়ে প্রাথমিক রিপোর্ট দিয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবকে। সেই রিপোর্টের ভিত্তিতে আজ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব আবার রাজ্যের মুখ্যসচিবকে চিঠি দিয়েছেন। যেখানে বলা হয়েছে রাজ্যে মৃত্যুর হার ১৩.‌২ শতাংশ। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ জনে ১৩ জনেরও বেশি মৃত্যু হয়েছে করোনায়।

রাত ১০.‌৩৭

বুলা’দির জন্য চিন্তা হয়, তিনি তো প্রীতি জিন্টা নয়।

লকডাউন ডায়েরি

৫.‌০৫.‌২০২০। মঙ্গলবার

সকাল ৮.‌৪৭

সকালটা একটা ভাল খবর দিয়ে শুরু হল বলে মনে হচ্ছে। টুইটারে একটা বিদেশি কাগজের হ্যান্ডলে দেখছি ইজরায়েল ইনস্টিটিউট অফ বায়োলজিক্যাল রিসার্চ নাকি কোভিড–১৯ ভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি করে ফেলেছে। যাকে পরিভাষায় বলা হয় ‘প্যাসিভ ভ্যাকসিন’। ইজরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক তেমনই দাবি করেছে। এখন তারা ওই অ্যান্টিবডির পেটেন্ট নেওয়ার কাজ শুরু করছে। যাতে এর কমার্শিয়াল বিপণন করা যায়।

এমন অনেক দাবিই অবশ্য চারদিকে সোশ্যাল মিডিয়ায় অহরহ ঘুরছে। জানি না, এর সত্যতা কতটা। ফেক নিউজ কিনা তা–ও বলতে পারব না। হয়ত কোনও জ্ঞানী এবং ওয়াকিবহাল জানাবেন, এটা আদৌ ঠিক নয়। কিন্তু দেশটা ইজরায়েল বলেই অত সহজে উড়িয়ে দিতে পারা যাচ্ছে না। পাশাপাশি একটা আশাও তো কাজ করে। মনে হয়, কতদিন চলবে এই পরিস্থিতি। আরও কতদিন?‌ এই ধরিত্রীর কেউ কি কোনও সুরাহা করতে পারবে না?‌ অনেকদিন তো হল!‌

সকাল ৮.‌৫০

সত্রাজিৎ ফেসবুক স্টেটাসে একটা পোস্টার শেয়ার করেছে। দেখে এই ঘনঘোর অবস্থাতেও হাসি পেল— ‘পাত্র আইআইটি ইঞ্জিনিয়ার, সুদর্শন, বয়স ৩৬, মধ্য কলকাতায় বাড়ি, দাবিহীন। অনূর্ধ্ব ২৫, সুশ্রী, স্নাতকোত্তর, গ্রিন জোন নিবাসী পাত্রী চাই’।

মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। কিন্তু এটুকু লিখতেই হচ্ছে যে, এমন বিপদেও মানুষের রসবোধ চলে যায়নি। আমার কাছে এটা একটা পজিটিভিটি তো বটেই। হতে পারে, যাঁরা এই পোস্টারগুলো তৈরি করছেন, তাঁদের অবস্থা তুলনায় ভাল। কিন্তু আসলে তো মোটের উপর কারওরই অবস্থা ভাল নয়। তার মধ্যেও যাঁরা লঘু রসিকতা সম্পৃক্ত মস্তিষ্কটি সজাগ এবং সচল রেখেছেন, তাঁদের স্যালুট।

সকাল ৯.‌৩২

অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে রাহুল গান্ধীর ভিডিও কনফারেন্স দেখলাম। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বললেন, দেশের প্রত্যেক নাগরিককে সাময়িক রেশনকার্ড দেওয়া উচিত। আরও বললেন, লকডাউনের জেরে দেশ জুড়ে যে ভয়াবহ দারিদ্র দেখা দেবে, তার মোকাবিলায় ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে এবং গ্রামীণ এলাকায় বিশেষ নজর দিতে হবে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে আলাদা পরিকল্পনা করতে হবে।

এগুলো সবই প্রয়োজনীয় এবং জরুরি পদক্ষেপ। কিন্তু রাহুলের সঙ্গে আলোচনায় উনি যে পরামর্শ দিলেন, তা কি কেন্দ্রীয় সরকার আদৌ গ্রাহ্য করবে?‌ আমাদের দেশে কি রাজনৈতিক দলগুলো এতটা উদার হতে পারে?‌

অন আ লাইটার নোট, লকডাউনের সময় রাহুল যেভাবে পরপর বিশিষ্টদের ভিডিও সাক্ষাৎকার নিতে শুরু করেছেন, তাতে এরপর টিভি অ্যাঙ্করদের চাকরি নিয়ে টানাটানি না পড়ে!‌ তবে রাহুলের শোয়ে অতিথিদেরই বেশি কথা বলতে দেওয়া হয়।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফেও আজ অভিজিৎ ইউটিউবে একটি ভিডিওবার্তা দিয়েছেন। ২ মিনিট ৮ সেকেন্ডের সেই বার্তায় তিনি বলেছেন, ‘এই লড়াইয়ে জিত নিশ্চিত। তবে হয়তো এখনই জয় হবে না। কয়েকমাস লাগবে।’ করোনা সংক্রমণ রুখতে প্রাথমিক করণীয়গুলি আবার মনে করিয়ে দিয়ে অভিজিৎ বলেছেন, ‘কাশি বা জ্বর হলেই করোনা নয়। কিন্তু তেমনকিছু হলে তা সঙ্গে সঙ্গে জানান। সুস্বাস্থ্যে থাকবেন। আশা হারাবেন না। আমার নমস্কার নেবেন।’

সকাল ১০.‌০৫

পুত্রসন্তানের মা হয়েছেন কোয়েল মল্লিক। অর্থাৎ, বাবা হলেন নিসপাল সিং, দাদু হলেন রঞ্জিত মল্লিক এবং দিদা হলেন রঞ্জিতের স্ত্রী। সোশ্যাল মিডিয়ায় সদ্যোজাত সন্তানের সঙ্গে একটি মিষ্টি ছবি–সহ পোস্টার শেয়ার করেছেন সদ্যোজাত বাবা–মা। সকলে কোয়েল এবং নিসপালকে অগাধ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। কিন্তু সস্ত্রীক রঞ্জিতকেও শুভেচ্ছা জানানো উচিত। কোয়েলের সঙ্গে আমার পরিচয় নেই। চোখেও দেখিনি কখনও। তবে শুনেছি, তাঁর সহবত দৃষ্টান্তযোগ্য। এবং তার কৃতিত্ব তাঁর মায়ের। তিনি নাকি খুবই কঠোর অনুশাসনে মেয়েকে বড় করেছেন। বাবা হিসেবে রঞ্জিতও অতুলনীয় বলেই শুনেছি।

এমনিতে কোয়েলের ইন্টারভিউ নেওয়ার অভিজ্ঞতাসম্পন্নরা বলে থাকেন, তিনি ভীষণরকমের পলিটিক্যালি কারেক্ট। কোনও বিতর্কিত মন্তব্য করেন না। তেমন কোনও প্রশ্ন করলে কেরিয়ার ডিপ্লোম্যাটের কায়দায় এড়িয়ে যান। আর প্রায় সব কথাতেই ঐশ্বর্য রাইয়ের মতো হেসে গড়িয়ে পড়েন। যাকে আমাদের মতো সাধারণ মানুষরা ‘গিগলিং’ বলে অভিহিত করি। কিন্তু সাক্ষাৎকারের বাইরে ব্যক্তিগত পরিসরেও কোয়েল খুবই ‘সর্টেড’ বলে এক সম্পাদক অনেক আগে জানিয়েছিলেন।

আশা করব, কোয়েল তাঁর পুত্রকেও ঠিক সেভাবেই বড় করবেন, যেভাবে তাঁর মা তাঁকে করেছিলেন। এক অভূতপূর্ব সময়ে জন্ম নিয়েছে তাঁর সন্তান। এক কঠিন সময়ে পৃথিবীর আলো দেখেছে সে। যে আলো এমনিতেই খুব আশাপ্রদ নয়। কিন্তু জীবন তো আর থেমে থাকে না। নবাগতকে বেঁচে থাকতে হবে এই অসুস্থ পৃথিবীর সঙ্গে লড়াই করে। ফলে তার এবং তার জনক–জননীর বাড়তি শুভেচ্ছা প্রাপ্য এবং প্রয়োজনীয়।

বেলা ১১.‌১১

ছোটবেলার পাড়ার জুনিয়র শান্তু ফেসবুকে স্টেটাস লিখেছে, ‘সুখবর। কাল যাঁরা দোকানে দোকানে লাইন দিয়ে মদ কিনেছেন, তাঁদের জন্য আজ হেলিকপ্টার থেকে চানাচুর ছড়ানো হবে’।

দেখে হাসি পেল ঠিকই। কিন্তু পাশাপাশি ওই ছবিটাও মনে পড়ে গেল। দেশের কোনও এক এক্সপ্রেসওয়ে ধরে সন্তান আর বোঁচকা–বুঁচকি নিয়ে হেঁটে আসছে এক পরিবার। দুই মহিলার একজনের কাঁধ থেকে একটা গ্যাদা বাচ্চা মোটা করে কাজল–পরা চোখে জুলজুল করে তাকিয়ে রয়েছে। অন্য এক মহিলার কাঁখ থেকে ঝুলছে আরেকটি শিশু। সেই মহিলার মাথায় একটা নোংরা বস্তা। তাঁর পাশে কাঁধে ওইরকমই একটা বস্তা নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘাড় ঘুরিয়ে আকাশে দেখছেন একজন। কারণ, তাঁদের মাথার ঠিক উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে ভারতীয় বায়ুসেনার দানবীয় এমআই–১৬ হেলিকপ্টার। সেখান থেকে নীচে ঝরে পড়ছে রক্তগোলাপের হাজার হাজার পাপড়ি।

কপ্টারের রোটর ব্লেডের হাওয়ার ঝাপটায় সেই ফুলের পাপড়ি উড়ে যাচ্ছে, ছড়িয়ে যাচ্ছে চারদিকে। আর সেই দাপট থেকে মাথা বাঁচাতে সড়কের উপর ক্রমশ আরও জড়সড় হয়ে পড়ছে তিনটে ক্ষয়াটে চেহারার মানুষ।

ছবিটা টুইট করে একজন লিখেছিলেন, ‘মোদি’জ ইন্ডিয়া ফ্লাইজ হাই— ওভার দ্য রিয়েল ইন্ডিয়া’। ঠিকই। সকল দেশের রানি, সে যে আমার জন্মভূমি!‌

বেলা ১১.‌৩০

একটা রেলগাড়ি বারবার ঘুরেফিরে আসছে চিন্তায়। সেটা মাথায় ঢুকেছে ‘দ্য হাম্বলিং’ ছবি থেকে। সাইমন অ্যাক্সলার এক বয়স্ক থিয়েটার অভিনেতা। মনোরোগী। ভিডিওতে যার নিয়মিত থেরাপি হয়। পেল্লাই একটা বাড়িতে সে একা থাকে আর বিভিন্ন বিষয় হ্যালুসিনেট করতে থাকে। ঘটনাক্রমে সাইমন তার থেকে ৩২ বছরের ছোট একটি লেসবিয়ান মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। মেয়েটির মা সাইমনের বন্ধু ছিলেন। মেয়েটির বয়স যখন ৮ বছর, তখন সাইমন ৪০। তখন থেকেই সাইমন তার হিউজ ক্রাশ। এতবছর পর বান্ধবীকে ছেড়ে এসে ৬৭ বছরের বৃদ্ধ সাইমনের সঙ্গে থাকতে শুরু করে সেই মেয়ে। যে এখন ডাগর যুবতী। বৃদ্ধ সাইমনকে সিডিউস করে সে প্রায় বাধ্য করে তার সঙ্গে সম্পর্কে জড়াতে।

সাইমনের রোলে আল পাচিনো। সেজন্যই দেখতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু ছবিটা খুবই স্লো। দেখে খুব একটা ভালও লাগল না। শুধু একটা বিষয় ছাড়া। সাইমনের বাড়িতে মেয়েটি আসার পর প্রথমদিনই দু’জন মিলে সারা বাড়িতে খেলনা ট্রেনের লাইন পাতে। তারপর সেই ট্রেন চলতে থাকে খাটের তলা দিয়ে, ডাইনিং টেবিলের পাশ কাটিয়ে, সোফার ধার ঘেঁষে অথবা বই স্তূপ করে বানানো কৃত্রিম সেতুর উপর দিয়ে। আর নিবিষ্টমনে সেই যাত্রা নিরীক্ষণ করতে থাকে দুই অসমবয়সী প্রেমিক–প্রেমিকা।

দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, ছবিতে সাইমনের জীবনের মতোই বিরতিহীন এক যাত্রাপথে ট্রেনটা ঘুরে যাচ্ছে। ঘুরেই যাচ্ছে। গোল গোল। পথের শেষ নেই। প্রান্তিক স্টেশন নেই। কোথাও তার যাত্রা শেষ হচ্ছে না। একটু ডিস্টার্বিং। এই সময়টার মতো। অন্তহীন।

দুপুর ১২.‌২৩

রাজ্যের পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে আজমেড় থেকে প্রথম ট্রেনটি ডানকুনিতে পৌঁছেছে। আরোহীদের প্ল্যাটফর্মে নামিয়ে স্প্রিঙ্কলার থেকে মিথাইল অ্যালকোহল ভিত্তিক হ্যান্ড স্যানিটাইজারের সঙ্গে জল মেশানো জীবাণুনাশক আগাপাশতলা স্প্রে করে, থার্মাল স্ক্রিনিং করিয়ে এবং হাতে ১০টা করে হাইড্রক্সিক্লোরোকুইন ট্যাবলেট ধরিয়ে কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। দেওয়া হয়েছে কোয়ারেন্টিন বিধি মানার জন্য ছাপানো নির্দেশিকা। অর্থাৎ, বাড়ির কাছে পৌঁছেও তাঁদের বাড়ি ফেরা হল না। আরও কত দুর্গতি যে আছে এঁদের কপালে!‌‌

দুপুর ১.‌৪৩

তাঁর আর স্ত্রী এস্থার দুফলোর ছবি নিয়ে টুইটারে আবির্ভূত হলেন অভিজিৎ বিনায়ক। সঙ্গে প্রথম টুইট, ‘আ বিট লেট। বাট ফাইনালি অন টুইটার টুডে’। টুইটার বায়োতে বলা হয়েছে, ‘অ্যান ইকনমিস্ট। নোবেল লরিয়েট। অফিশিয়াল টুইটার হ্যান্ডল। প্রোফাইল ম্যানেজ্ড বাই মি’। দেখছি ৫৭ মিনিট আগে অ্যাকাউন্ট খুলেছেন। এখনই ১৪৫ জন ফলোয়ার। দিন শেষ হওয়ার আগে নিশ্চয়ই এই সংখ্যাটা দ্রত বাড়বে।

মনে হচ্ছে, রাহুল গান্ধী আজ সকালে অভিজিৎকে এই পরামর্শটি দিয়েছেন। কারণ, দলে দলে কংগ্রেসের লোক এবং প্রদেশ কংগ্রেস কমিটি ওই হ্যান্ডলে হাজির হচ্ছে। তারা সকলেই তাঁর সঙ্গে রাহুলের কথোপকথন আপলোড করেছে। অভিজিৎ আবার সেগুলো রিটুইট করেছেন।

বিকেল ৪.১৫

আজ নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করছে আলাপন’দা। স্বরাষ্ট্রসচিব আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়। মুখ্যসচিব রাজীব সিন্‌হা নন। এটা ইন্টারেস্টিং। আলাপন’‌দা স্পষ্টভাষায়, কেটে কেটে বাছাই শব্দচয়নে কথা বলে। সেভাবেই বলছে, ‘রাজ্যে এখনও পর্যন্ত করোনায় মৃতের সংখ্যা ৬৮। কাল পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ছিল ৯০৮। আজ ৯৪০ জন।’ যেটা আরও ইন্টারেস্টিং, আলাপন’দা বলছে, ‘সমস্ত তথ্য গতকাল রাতে সওয়া ১১টার মধ্যে ‘এগিয়ে বাংলা’ ওয়েবসাইটে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমরা যথাসম্ভব স্বচ্ছ থাকার চেষ্টা করছি। ইট্‌স আ ট্রুথফুল অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্ট শেয়ারিং অফ ডেটা উইথ দ্য পাবলিক অ্যাট লার্জ।’

এটা কি সংখ্যা নিয়ে শাসক–বিরোধী চাপানউতোরের ফল?‌ কাল রাতেই সিপিএম দাবি করেছিল, নবান্ন থেকে মুখ্যসচিব যে তথ্য দিচ্ছেন, তার সঙ্গে স্বাস্থ্যভবনের ওয়েবসাইটের তথ্যের নাকি বিস্তর ফারাক। তারপরেই আজ সাংবাদিক বৈঠকে স্বরাষ্ট্রসচিবের আগমন। মুখ্যসচিব কি অন্য কাজে ব্যস্ত?‌ অসুস্থ?‌ নইলে তাঁর পরিবর্তে কেন স্বরাষ্ট্রসচিব ব্রিফ করছেন?‌ শাসনযন্ত্রের অন্দরে কি ভারসাম্যের কোনও বদল ঘটছে নিঃশব্দে?‌

বিকেল ৫.‌০০

কেন্দ্রীয় সরকারের কাছ থেকে সবুজ সঙ্কেত পাওয়ার পর করোনা মোকাবিলায় গুজরাতে একাধিক ওষুধের প্রয়োগমূলক পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আমেদাবাদের চারটি হাসপাতালে এই পরীক্ষা শুরু হয়েছে। যার পোশাকি নাম ‘সলিডারিটি ট্রায়াল ফর কোভিড–১৯’। হাসপাতালে ভর্তি করোনা আক্রান্ত রোগীর শরীরে ওই ওষুধগুলো প্রয়োগ করা হবে। বস্তুত, সারা পৃথিবীতেই নাকি এমন প্রায়োগিক পরীক্ষা শুরু হয়েছে।

বিকেল ৫.‌৪৫

মোবাইলের স্ক্রিনে ‘সুভাষ ভৌমিক’ নামটা ভাসছে। ধরলাম। অননুকরণীয় ভাঙা গলা ভেসে এল। চুনী’দার সঙ্গে একটা ছবি দরকার। যদি আজকালের আর্কাইভে থাকে। একটা ইংরেজি ম্যাগাজিনে তাঁর লেখার সঙ্গে ব্যবহার করার জন্য দিতে হবে। বললেন, ‘প্রদীপদার সঙ্গে আমার প্রচুর ছবি আছে। কিন্তু চুনীদার সঙ্গে কোনও ছবি পাচ্ছি না। একটু দেখবে প্লিজ?‌’

আলবাত দেখব!‌ কারণ, সুভাষ ভৌমিক হলেন সেই বিরল ক্রীড়াব্যক্তিত্ব যাঁর বুকের পাটা আছে। যা খুব বেশি স্পোর্টস সেলিব্রিটির দেখিনি।

১৯৯৪ সাল। ফুটবল বিশ্বকাপের সময় আমায় ফুরনের খাটুনি খাটতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে স্পোর্টস ডেস্কে। প্রাথমিক অ্যাসাইনমেন্ট সুভাষ’দার ম্যাচ রিপোর্টের অনুলিখন। তখনও তাঁর সঙ্গে সামান্যতম আলাপও নেই। ভাবছি, লোকটা কেমন। কীভাবে ডিল করব। লেখার আগে একবার তো কথা বলা দরকার। সেটাই বা কবে বলব। এসবই রোজ ভাবতাম। কিন্তু কথা বলাটা আর হয়ে উঠত না।

বরাবরই সকাল সকাল অফিস পৌঁছে যাওয়া অভ্যেস। তেমনই একদিন গিয়ে স্পোর্টস ডিপার্টমেন্টে বসে কাগজপত্র পড়ছি। তখনও অন্যরা এসে পৌঁছয়নি। কিড়িং কিড়িং করে এক্সটেনশনটা বাজল।

— হ্যালো।

‘কে বলছেন?’‌

— আপনি কে বলছেন?‌ ফোনটা তো করেছেন আপনি। আগে তো আপনাকে নিজের পরিচয়টা দিতে হবে।

‘সুভাষ ভৌমিক!’‌

— অনিন্দ্য জানা। বলুন।

মুহূর্তে সহজ হয়ে গেলেন সুভাষ’দা, ‘আরে!‌ আমায় তো তোমার সঙ্গেই কাজ করতে হবে। আমি একদিন তোমাদের অফিসে যাব। তখন ডিটেইল্‌সে কথা বলে নেব।’

ঘটনাচক্রে, আমাদের জুড়ি সুপারহিট হয়ে গেল। টেকনিক্যাল দিকগুলো নিয়ে বিস্তর পড়াশোনা করতেন সুভাষ’দা। নিজের পয়সায় বিদেশি কাগজ আর ম্যাগাজিন আনিয়ে নিজেকে আপডেটেড রাখতেন। ফোনে ম্যাচ রিপোর্ট বলার সময় সেগুলো ফাঁকে ফাঁকে জুড়ে দিতেন। তবে আমি কপিতে খুব বেশি টেকনিক্যাল কচকচি রাখতাম না। বরং চেষ্টা করতাম একটা সহজ চলন রাখার। সম্ভবত সেজন্য পড়তে ভাল লাগত। সুভাষ’দারও পছন্দ হতো। আমাদের টিউনিং হয়ে গেল। অসম্ভব দিলদরিয়া লোক ছিলেন। একদিন তো বাড়ি থেকে সর্ষেবাটা দিয়ে ইলিশমাছ রেঁধে পাঠিয়ে দিলেন ডিপার্টমেন্টের সকলের জন্য। আমার জন্য একটা বিদেশি টি–শার্ট পাঠালেন একদিন। নীতিগতভাবে পেশাগত ক্ষেত্রে কোনও উপহার নিই না। ওটা ফেরাইনি।

হইহই করে বিশ্বকাপ চলে গেল। সহজাত আলস্যে যোগাযোগটাও ক্ষীণ হয়ে গেল। কয়েকমাস পরে সুভাষ’দা ফোন করে নিউ আলিপুরের বাড়িতে গেট টুগেদারে ডাকলেন। সাধারণত কোথাও যাই না। ওটায় গেলাম। গিয়ে দেখি, ক্রীড়াজগতের প্রচুর লোক। ছাদে ম্যারাপ। বিশাল আয়োজন। গমগম করছে চারদিক। আমি তো নেহাতই নাদান। কাউকে খুব একটা চিনিও না। সরু হয়ে এদিক–ওদিক ঘুরঘুর করছি। আমন্ত্রিতরা সকলে আসার পর সুভাষ’দা নিচ থেকে গিয়ে মা’কে নিয়ে এলেন। তারপর গর্ভধারিনীকে জড়িয়ে ধরে অভ্যাগতদের বললেন, ‘সকলে শোনো। মা, তুমিও শোনো। তোমরা যে আনন্দবাজারে আমার বিশ্বকাপের লেখা পড়ে ধন্য ধন্য করেছো, তার সবগুলো ওই অনিন্দ্য জানা লিখেছে!‌’

হইচই থেমে গিয়ে চারদিক আচমকা নিঝুম হয়ে গেল। আমার তো ‘ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা। এমব্যারাসমেন্টের চূড়ান্ত। সুভাষ’দা বোধহয় বুঝতে পেরেছিলেন পালানোর ফাঁক খুঁজছি। সটান এসে খপাত করে ধরলেন। তারপর আমার ডানহাতটা উপরে তুলে ধরে বললেন, ‘এটা সোনার হাত। এই হাত না থাকলে লেখক সুভাষ ভৌমিককে কেউ চিনত না!‌’

ছাব্বিশ বছর কেটে গিয়েছে। ঘটনাটা ভুলতে পারিনি। তারপরেও বহু সেলিব্রিটির অনুলিখন করেছি। আমার সামনেই তাঁরা দিব্যি নিজেদের লেখার প্রশংসা গিলে নিয়েছেন। পাবলিকলি তো দূরস্থান, ব্যক্তিগত স্তরেও কখনও অ্যাকনলেজ করেননি। সুভাষ ভৌমিক কঠোর ব্যতিক্রম হয়ে রয়ে গিয়েছেন। একমাত্র ব্যতিক্রম।

সেই ব্যতিক্রমী উদারতার কাছে আর্কাইভ গরুখোঁজা করে চুনী গোস্বামী–সুভাষ ভৌমিকের ছবি বার করা আর এমন কী!‌ পাঠিয়ে দিলাম।

রাত ৮.‌১৩

৪২ বছর আইএএসের চাকরি করে অবসর–নেওয়া এবং প্রসার ভারতীর প্রাক্তন সিইও জহর সরকারের কয়েকদিন আগে করা একটা টুইট হঠাৎ ভেসে উঠল।

ভারতের আছে—
১টি হাসপাতালের বেড পিছু ১,৮২৬ জন রোগী
১ জন ডাক্তার পিছু ১১,৬০০ জন অসুস্থ
১টি আইসোলেশন বেড পিছু ৮৪,০০০ করোনা–সন্দেহভাজন

ভারত ব্যয় করেছে—
৬,০০০ কোটি বিজ্ঞাপনের জন্য
৯,১৩০ কোটি মূর্তি বসাতে
২,০২১ কোটি বিদেশযাত্রা বাবদে

ভারত যা গড়তে পারত—
১৭টি এইমস
৩৫টি সরকারি মেডিক্যাল কলেজ
৫০টি সরকারি হাসপাতাল

রাত ১০.‌২৫

এখনও জহর’দার টুইটটার কথা ভাবছি।

বিরতিহীন যাত্রাপথে ট্রেনটা ঘুরেই যাচ্ছে। গোল গোল। পথের শেষ নেই। প্রান্তিক স্টেশন নেই। ডিস্টার্বিং। এই সময়টার মতো। অন্তহীন।

লকডাউন ডায়েরি – ৪ মে, ২০২০

০৪.‌০৫.‌২০২০। সোমবার

সকাল ৮.‌০৫

কাল রাতে বাড়িতে ঢোকার সময় ব্যাপক স্কিল দেখিয়েছি। কাঁধে আড়াআড়ি অফিসের ব্যাগ ঝুলছে। একহাতে দুটো প্যাকেট। অন্যহাতে ডেলিকেটলি ব্যালান্স করা ৩০টা ডিম ভর্তি পিচবোর্ডের ক্রেট। সুতলি দড়ি দিয়ে বাঁধা। ট্র্যাপিজের খেলা খেলতে খেলতেই প্যাকেটদুটো আঙুলে ঝুলিয়ে ওই হাতে চাবি নিয়ে গেটের তালা খুলে ফেললাম। এরপর অন্ধকারে সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে হবে। হোঁচট খেলে পড়ে গিয়ে ডিম ফাটবেই।

রাস্তা দেখানোর আলো চাই। একতলার আলো জ্বালানো যেত। কিন্তু এখনও সুইচ মুখস্থ হয়নি।

এইবার স্কিলের খেলা। মোবাইলের টর্চটা অন করে সেটাকে এমনভাবে ট্রাউজারসের পকেটে রাখলাম, যাতে মোবাইলটা পকেট থেকে আলোসমেত মুণ্ডুটা বার করে রাখে। তারপর পা ৪৫ ডিগ্রি অ্যাঙ্গলে বাঁকিয়ে (‌কারণ, পা সোজা করলে পকেটও সোজা হয়ে টর্চ–সহ মোবাইল সেই অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে)‌ আস্তে আস্তে একতলা থেকে দোতলায় উঠলাম। ডিম অক্ষত। আমিও। হাতের প্যাকেটও অক্ষুন্ন। ইয়েস!!!

‌সকাল ৮.‌২৫

কাল বেশি রাতে দিব্য’দা ফোন করেছিল। বহু, বহুদিন পর। এই একেকটা ফোন পুরোন দিনের জানালাগুলো সব হাট করে খুলে দেয়। এটা একেবারেই কাকতালীয় যে, কাল রাতে অফিসের বারান্দায় বসে মুড়িয়ে মাথার পিছনের চুল কাটার সময় দিব্য’দার মুখটাই ভেসে উঠেছিল। কারণ, বহুকাল ধরে দিব্য’দা মুণ্ডিতমস্তক। ওটাই ওর স্টাইল। টকটকে ফর্সা রং। মোটা গোঁফ আর ন্যাড়ামাথা। দেখানো উচিত ছিল বলিউডের ভিলেনের মতো। কিন্তু ভিলেনদের আবার এত সুন্দর দেখতে হয় না।

একদা আলোড়ন–ফেলা অনুসন্ধানমূলক টিভি প্রোগ্রাম ‘খোঁজখবর’–এ জনক দিব্য’দা একসময়ে আনন্দবাজারে কাজ করত। তখন থেকেই আমাদের বন্ধুত্ব। বন্ধুত্বও ঠিক নয়। স্নেহের সম্পর্ক। কেন জানি না, দিব্য’দা আমায় খুবই স্নেহ করত। একুশে জুলাই পুলিশের হাতে বেধড়ক মার খেয়ে যখন আমি হাসপাতালে ভর্তি, দিব্য’দা দেখতে গিয়ে মাথায় হাত রেখেছিল। সেই স্পর্শের মধ্যে কোথাও একটা বড়দা–সুলভ আশ্বাস ছিল। সেই ছোঁয়াটা আজও মিস্‌ করি। কালক্রমে আমি, দিব্য’দা আর আমার সঙ্গে একইদিনে আনন্দবাজারে জয়েন–করা নন্দিনী একটা গ্রুপ হয়ে গেলাম। অ্যাসাইনমেন্টের ফাঁকে তিনজন মিট করে গড়ের মাঠে গিয়ে ফুচকা খেতাম। কখনও আউট্রাম ঘাটের ‘গে’ রেস্টুরেন্টে গিয়ে আইসক্রিম। এমনও হয়েছে যে, তৎকালীন চিফ রিপোর্টার শ্যামল’দার থেকে গাড়ির স্লিপ সই করিয়ে দুপুরে ওঁর সল্টলেকের বাড়িতে গিয়ে বৌদির কাছে আব্দার করে লুচি–আলুরদম খেয়ে আবার সোনামুখ করে অফিসে ফিরে এসেছি। শ্যামল’দা জেনেছেন রাতে বাড়ি ফিরে। কারণ, বৌদিকে পইপই করে বলা ছিল ঘুণাক্ষরেও যেন মুখ না খোলেন। বিরাট কেস খাব।

এসব কাহিনি নন্দিনী আবার নাইট ড্রপে বাড়ি ফেরার সময় ম্যাগাজিনের এক মহিলাকর্মীকে বলেছিল। তিনি তো বেজায় উত্তেজিত, ‘তার মানে তোমাদের আনন্দবাজারে তেমন কোনও কাজই নেই?‌’ নন্দিনী বলেছিল, ‘নাহ্‌, কাজ আর কোথায়। ওই গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে একটু ঘুরেটুরে, খাওয়াদাওয়া করে আবার অফিসে ফিরে আসি। ওটাই কাজ।’ সম্ভবত সারারাত চিন্তাভাবনা করে ওই মহিলা পরদিনই ম্যাগাজিন থেকে আনন্দবাজারে ট্রান্সফার হওয়ার দরখাস্ত করেন। একমাসের মধ্যে তাঁকে আনা হল আনন্দবাজারে। কিন্তু দেখা গেল, ডিপ ফাইন লেগেও লুকিয়ে রাখা যাচ্ছে না। ইন ফ্যাক্ট মাঠে না নামাতে পারলেই ভাল হয়। নন্দিনীর কাছে একদিন তিনি অভিযোগও করলেন, ‘তুমি তো আমাকে কমপ্লিটলি মিসগাইড করেছিলে!‌ এখানে তো প্রচন্ড কাজের চাপ। আমি ভাবলাম, ম্যাগাজিনে অত চাপ। তাই ডেইলিতে গিয়ে দেখি। এখানে তো দমই ফেলতে পারছি না।’

নন্দিনী বলেছিল, ‘ম্যাগাজিনের চেয়ে ডেইলি কাগজে কাজের চাপ কখনও কম হয়?‌ হয় না যে, সেটা তো তো একটা শিশুও জানে। তুমি যদি ইয়ার্কিকে সিরিয়াসলি ধরে ট্রান্সফার নিয়ে বসো তাহলে আমি কী করব!‌’

কিন্তু দৈনিক কাগজের কাজের চাপে যে নিয়মিত ভেঙে পড়ে, তাকে কে আর দায়িত্ব দিয়ে নিজের কাজ কঠিন করতে চায়?‌ ফলে তাঁকে ডিপ ফাইন লেগ থেকে দ্রুত গ্যালারিতে পাঠানোর ব্যবস্থা হচ্ছিল। তেমন একটা সময়েই এক রাতে নিকটবর্তী পানশালা থেকে মহিলার বস্‌ ফেরার পর তিনি গুনগুন করে অনুযোগ করতে থাকেন, দারুণ কর্মদক্ষ হওয়া সত্ত্বেও স্রেফ পলিটিক্স করে তাঁকে কোনও কাজ দেওয়া হচ্ছে না। শুনে মেজাজি এবং ততক্ষণে হুইস্কিতে আরও ফুরফুরে বস্‌ মহিলার মুখের সামনে দুটো হাত তুলে ধরে বলেন, ‘তুমি কি জানো আমার এই ১০ টা আঙুলই প্লাস্টিক সার্জারি করা?‌’

— তাই?‌ জানতাম না তো! প্লাস্টিক সার্জারি কেন?‌

বি’কজ আই হ্যাভ বার্নড মাই টেন ফিঙ্গার্‌স আফটার আই হ্যাভ টেক্‌ন ইউ!‌

কথোপকথন সেখানেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।

‌দিব্য’দার ফোন পেয়ে সেই দিনগুলো মনে পড়ে গেল। কিন্তু দিব্য’দার কেন মনে পড়ল আমার কথা?‌ শোনা গেল, ‘তোর কথা মনে পড়ল আজ সকালে কাটলেট বানাতে গিয়ে। মনে আছে একদিন আমি, তুই, নন্দিনী কাটলেট খেতে গিয়েছিলাম বালিগঞ্জ ফাঁড়িতে?‌ দুটো একটু আগে ভাজা কাটলেট ছিল আর একটা তখনই ভাজা। নন্দিনী হাত বাড়িয়ে সদ্যভাজাটা প্লেট থেকে তুলে নিয়ে একটু লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, গরমটাই নিই?‌’

মনে পড়ল। এ–ও মনে পড়ল যে, তারপর থেকে খাবার এলেই আমরা বলতাম, গরমটাই নিই?‌ আর নন্দিনী প্রচণ্ড বিব্রত হতো।

খুব হ্যা–হ্যা করে হাসলাম দু’জন। গরমটাই নিই!‌

সকাল ৮.‌৫৫

কাল রাতে অস্কার ট্রফির মতো কৃষ্ণবর্ণ, তণ্বী এবং সুশ্রী বোতলে সয়া সস এসেছে। এটি মাংস ভাজার এক্সপেরিমেন্টে ব্যবহার করা হবে। আমি অবশ্য অনেক বেশি প্রসন্ন হয়েছি বোতলটা বাব্‌ল র‌্যাপে মুড়ে পাঠানোয়। পুটপুট করে বাব্‌লগুলো ফাটাতে যে কী ভাল লাগে! ‌ঘুমোতে যাওয়ার আগে অনেকক্ষণ ধরে মহা আনন্দে ফাটালাম। আরও একটু বেশি থাকলে সারা রাত ধরেও ফাটাতে পারতাম। ওটায় আমার কোনও ক্লান্তি নেই।

শুনেছি, ঠাট্টা করে মনোবিদ্যার ভাষায় একে বলা হয়, ‘ওসিডি – অবসেসিভ কম্প্রেসিভ ডিসঅর্ডার’ ।

বেলা ১১.‌০২

সঞ্জয়’দা ফোন করল। আনন্দবাজারের প্রাক্তন সহকর্মী। কেরিয়ারের প্রথমদিকে কাজ শিখেছি সঞ্জয়’দার কাছে। পরে ‘এবেলা’ শুরুর সময় অভীকবাবুর অনুমতিসাপেক্ষে অবসরের পরেও সঞ্জয়’দাকে নিয়ে এসেছিলাম নতুনদের ট্রেনিং দিতে। স্মার্ট ব্যাচেলর এখন ৭০ বছরে। সাঁতার কাটতে পারছে না বলে খুব দুঃখ। আরও দুঃখ, সমস্ত চ্যানেলে পুরোন খেলা রিপিট করছে বলে। বলল, ‘এটা একটা সাম্যবাদী ভাইরাস। বুঝলি?‌ ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী থেকে ভারতের ভিখিরি— সকলকে সমান ভালবাসে।’

বেলা ১১.১৬

পরিযায়ী শ্রমিকদের নিয়ে গোলমাল ক্রমশ বাড়ছে। যে ‘শ্রমিক স্পেশাল’ ট্রেনে তাঁদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে, শ্রমিকদের কাছেই তার ভাড়া চেয়ে বসেছে কেন্দ্রীয় সরকার।‌ এ এক আশ্চর্য দেশ!‌ আরও আশ্চর্য তার শাসনকর্তারা। যে মানুষগুলোর সব গিয়েছে, ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত, তাদের উপরই আবার কোপ মারছে। এরা কি মানুষ?‌ নাকি একেই ওয়েলফেয়ার স্টেট বলে?‌ কল্যাণকামী রাষ্ট্র?‌ মাই ফুট!‌ রেলবোর্ডের এক কর্তা নাকি বলেছেন, ‘আমরা মানুষের ভাড়া না দেওয়ার অভ্যেসটা বদলাতে চাই।’ বোঝো ব্যাপার!‌

করোনা তাণ্ডবের ফলে যে ভারতীয়রা বিদেশে আটকে পড়েছিলেন, তাঁদের বিনাপয়সায় দেশে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিল সরকারি কেরিয়ার এয়ার ইন্ডিয়া। তাঁদের কাছে কিন্তু বিমানভাড়া চাওয়া হয়নি। অথচ, দেশের লাইফলাইন ভারতীয় রেল সেটা করে দেখাতে পারল না। ছি–ছি!‌

এই আবহে সনিয়া গান্ধী বলেছেন, পরিযায়ী শ্রমিকরা যে যে রাজ্যের মানুষ, সেই রাজ্যের প্রদেশ কংগ্রেস তাঁদের রেলভাড়ার টাকা দিয়ে দেবে। নিঃসন্দেহে এটাও পলিটিক্স। কিন্তু সময়োপযোগী রাজনীতি। গুড পলিটিক্স। কারণ, তার পরেই বিজেপি–র এমপি সুব্রহ্ম্যণম স্বামী টুইট করেছেন সরকারকে ‘নির্বোধ’ বলে। তার কিছুক্ষণ পর আরও একটি টুইটে দাবি করেছেন, তিনি রেলমন্ত্রী পীযূষ গোয়েলের অফিসের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারপর নাকি ঠিক হয়েছে, পরিযায়ী শ্রমিকদের ভাড়ার ৮৫ শতাংশ দিয়ে দেবে কেন্দ্রীয় সরকার। বাকি ১৫ শতাংশ সংশ্লিষ্ট রাজ্য। বোঝা যাচ্ছে, সনিয়ার ঘোষণায় চাপ খেয়েছে কেন্দ্র।

হাজার হাজার নাচার মানুষের প্রতি দেশের সরকারের এই ক্যালাস অ্যাটিটিউড আর তাদের নিয়ে এই রাজনীতি দেখে ঘেন্না হয়। নিস্ফল ক্রোধ হয়। দিনের পর দিন দেখি সাহায্য করে পলিটিক্যাল মাইলেজ নেওয়ার জন্য জিভ বার করে বসে থাকে নেতারা। আর অসহায় মানুষগুলো দরজায় দরজায় লাট খেতে থাকে।

দুপুর ১২.‌২০

আজ এতক্ষণে ওয়ার্কআউট করে উঠলাম। পরপর কয়েকটা রাত ভাল করে ঘুম হয়নি। খুব ক্লান্ত লাগত। আজও লাগছিল। ভেবেছিলাম, আজ ফাঁকি মেরে ল্যাদ খাই। বাইরে কেঠো গরম। ঘর থেকে বেরোলে চোখমুখে ঝাঁ ঝাঁ করে তাপ এসে লাগছে। ওয়ার্কআউট করলে ব্যাপক ঘামব। ফলে আজ বাদ থাকুক। সেইমতোই এগোচ্ছিলাম। তারপর মনে হল, নাহ্‌, করেই ফেলি। শৃঙ্খলাটা রাখা দরকার। আড় ভেঙে ঘামটা ধরালে একটু ঝরঝরেও লাগে। কয়েকটা আইটেম কম করলাম অবশ্য। তবু হাঁফ ধরল। তবু ঘাম ঝরল। তবু জলতেষ্টা পেল।

দুপুর ১.‌৪৫

ওরেব্বাস!‌ কী কান্ড হচ্ছে দেশে। টিভি–তে দেখছি, ইস্ট দিল্লির মদের দোকানের সামনে অষ্টমীর সন্ধ্যার একডালিয়ার মতো ভিড়। সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিংকে চুলোর দোরে দিয়ে হাজার হাজার লোক ধাক্কাধাক্কি, ঠেলাঠেলি করছে। চোখে না দেখলে বিশ্বাস হতো না। কিলোমিটার পর কিলোমিটার লম্বা, বিসর্পিল লাইন চলে গিয়েছে কতদূর কে জানে। আর ঢেউয়ের মতো মানুষ এসে আছড়ে পড়ছে ওয়াইন শপের গেটে। বেলা ১২টার মধ্যে নাকি স্টক শেষ। তা–ও দেড়হাজার লোক লাইনে দাঁড়িয়ে। লাঠি ঠুকে ঠুকে পুলিশ নিয়ন্ত্রণের একটা চেষ্টা করছে বটে। কিন্তু এভাবে কি আর ওই জলতরঙ্গ রোধ করা যায়?‌

টিভি–তে দেখছি, কলকাতায় হাজরার কাছে একটা দোকানের সামনেও থিকথিক করছে ক্রেতা। পুলিশ ভিড় সামলাতে হিমসিম খাচ্ছে। শেষে নাকি লাঠিচার্জ করে ভিড় ছত্রভঙ্গ করতে হয়েছে। কয়েকজনকে আটক করে থানাতেও নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

আলিপুরদুয়ারে আবার কড়া রোদ্দুরে লাইনে দাঁড়ানোর কষ্ট সইতে না–পেরে ইট দিয়ে লাইন রেখে ছায়ায় গিয়ে অপেক্ষা করেছেন পিপাসুরা।

ভাবছিলাম, করোনার ভ্যাকসিন পাওয়া গেলে এই লাইন পড়ত?‌ কে জানে!‌ মদ্যপান করি না। ফলে এই আকুলতা ঠিক বুঝতে পারছি না। পৃথিবীর যাবতীয় সুরারসিকদের ডিউ রেসপেক্ট দিয়েই বলছি, মদের নেশার তাড়না কি এতটাই হয়?‌ সত্যিই জানা নেই। এ তো মনে হচ্ছে উইথড্রয়াল সিম্পটমে ভোগা হাজার হাজার মানুষ নিজেদের মধ্যে চুলোচুলি করছে। করোনা যে আর কী কী দেখাবে!‌

দুপুর ৩.‌০৪

খেয়ে উঠে একটু গড়িয়ে নিয়ে অফিসে রওনা হব ভেবেছিলাম। কখন যেন ঘুমিয়ে পড়েছি। উঠে দেখছি ‘এবেলা’র প্রাক্তন সহকর্মী পৃথা একটা লম্বা হোয়াট্‌সঅ্যাপ পাঠিয়েছে। পড়তে পড়তে আবার দমকা হাওয়ার মতো দিনগুলো ভেসে এল।

পৃথা এখন রয়টার্সে চাকরি করে। বেঙ্গালুরুতে একা থাকে। মাঝে মাঝে কলকাতায় এলেও আমার সঙ্গে দেখা করা হয়ে ওঠে না। কিন্তু ওকে অত্যন্ত স্নেহ করি। এসেছিল স্পোর্টসে কাজ করার জন্য। কিন্তু ইন্টারভিউয়ের পর নিয়েছিলাম বিনোদনী সেকশন ‘ওবেলা’র জন্য। ভুল করিনি। ফ্যাশন নিয়ে চমৎকার সব স্টোরি করত। ফ্যাশন উইক কভার করত নিয়মিত। জানতাম, ওর মধ্যে মশলা আছে। ঠিকই জানতাম। সলিড কাজের লোক না হলে রয়টার্সে চাকরি পাওয়া যায় না।

পৃথা লিখেছে, দেরিতে হলেও ‘লকডাউন ডায়েরি’ পড়তে শুরু করেছে।

‘অনেকদিন ধরেই তোমার লকডাউন ডায়েরির প্রশংসা নানা জায়গা থেকে শুনছি। এতদিন কাজের চাপে সময় পাচ্ছিলাম না। কাল সারাদিনে বেশ কয়েকটা পড়লাম। কী ইন্টারেস্টিং করে লেখো তুমি। আই হ্যাভ বিন কিপিং আ জার্নাল এভার সিন্‌স দ্য লকডাউন। তোমার মতো না। জাস্ট মানডেন ডেলি হ্যাপেনিংস অ্যান্ড মেন্টালি হাউ আই অ্যাম ফিলিং স্টেয়িং অল অ্যালোন অ্যামিডস্ট আ লকডাউন। কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরে ভাবছিলাম, দিস জার্নাল ডাজন্‌ট সিম আইক আ জার্নালিস্ট্‌স অ্যাকাউন্ট। আই শুড পুট আ লিটল বিট অফ অ্যান এফর্ট টু মেক মাই রাইটিংস রিফ্লেক্ট মোর অফ দ্য সোশিও–পলিটিক্যাল ইভেন্টস দ্যাট আর আনফোল্ডিং ইচ ডে। যতই পার্সোনাল হোক, হোয়াট ইফ সামওয়ান ডিসকভার্‌স দিস জার্নাল মেনি ইয়ার্স লেটার আফটার মাই ডেথ। দে আর জাস্ট গোয়িং টু লাফ অ্যাট মি।

‘তোমার লেখাগুলো পড়ে খুব ইন্সপায়ার্ড হলাম। এখন মনে হচ্ছে আরেকটু যত্ন নিয়ে লিখব। যতই ব্যক্তিগত কথা লিখি। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।

শেষে হ্যাশট্যাগ ‘মেন্টরফরএভার’।

মোবাইলটা হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ বসে রইলাম। বায়োস্কোপের স্লাইডের মতো ‘এবেলা’র দিনগুলো সরে সরে যাচ্ছিল। ওদের সঙ্গে প্রতিদিনের কাজ, বকাবকি, ভাল হলে পিঠ চাপড়ে দেওয়া, সেলিব্রেট করা— সব মনে পড়ছিল। মনে পড়ছিল, ওদের বলেছিলাম কোনও সেলিব্রটি মারা গেলে উই শুড নট মোর্ন হিজ অর হার ডেথ। রাদার উই উইল সেলিব্রেট ইট। ঋতু’দা, মান্না দে..‌ পরপর মৃত্যুতে আমরা ফাটিয়ে কভারেজ করেছিলাম। দেশবিদেশ থেকে বিভিন্ন লোকের লেখা যোগাড় করা, যতটা পারা যায় ঘটনার কাছাকাছি থেকে রিপোর্ট করা, টাইমলাইন, প্রয়াতদের অ্যাচিভমেন্ট। সর্বোপরি ডিজাইন এলিমেন্ট। ছবি বাছাই। সাদা–কালো ডিসপ্লে। যে কারণে ‘ওবেলা’র এন্টারটেনমেন্ট কভারেজ অতটা সাড়া ফেলেছিল। সিনেমার সমালোচনা করার সময় ওরা কাউকে রেয়াত করেনি। কারও মুখ মনে রাখেনি। কাউকে তোয়াজ করেনি। আই ওয়াজ সো সো প্রাউড অফ দেম!‌

কিন্তু সেসব গতজন্মের কথা। যখন মুকুল সোনার কেল্লায় থাকত। এতদিন পর এই ‘মেন্টরফরএভার’ হ্যাশট্যাগের জন্য তৈরি ছিলাম না। মনে হল যাক, তাহলে দিনগুলো বৃথা যায়নি।

দুপুর ৩.‌‌৪০

কাল কলকাতায় আসছে কেন্দ্রের জনস্বাস্থ্য প্রতিনিধিদল। গতকাল খবরটা পেয়ে পেজ ওয়ানে নিয়েছিলাম। কারণ মনে হয়েছিল, এটা কেন্দ্র–রাজ্য যুদ্ধের আরেকটা ফ্রন্ট খুলে দেবে। ঠিকই মনে হয়েছিল। আজ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়, ডেরেক ও’ব্রায়েন আর দীনেশ ত্রিবেদী অনলাইন প্রেস কনফারেন্স করে তীব্র ক্ষোভ জানাচ্ছেন।

ঘটনাচক্রে, দু–সপ্তাহের সফর সেরে আজই কলকাতা ছেড়ে গেল প্রথম কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদল। যাওয়ার আগে দলের প্রধান তথা কেন্দ্রীয় সরকারের বিশেষ সচিব অপূর্ব চন্দ্র পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিবকে লেখা দীর্ঘ চিঠিতে বলেছেন, রাজ্য সরকার তাঁদের সঙ্গে সহযোগিতা করেনি। আরও বলেছেন, এ রাজ্যে করোনায় মৃতদের সংখ্যা কমিয়ে দেখানো হচ্ছে। তাঁদের বক্তব্য, এ রাজ্যে শতাংশের হিসেবে মৃত ১২.‌৮। যা সারা দেশে সর্বোচ্চ। চিঠিটা হাতে এসেছে। তাতে দেখছি লেখা, ‘এত মৃত্যু কম টেস্টিং এবং দুর্বল নজরদারির স্পষ্ট ইঙ্গিত’। চিঠির প্রতিলিপি পাঠানো হয়েছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিবের কাছে। বলা হয়েছে, এই প্রতিনিধিদল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকে তাদের রিপোর্ট জমা দেবে। ফলে আরও বড় যুদ্ধ সমাসন্ন।

অবশ্য ঘটনাচক্রে, ওই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে থাকা বিএসএফের এসকর্ট গাড়ির চালক করোনায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন!

ওদিকে গতকাল রাতে দূরদর্শনে ভাষণ দেওয়ার পর রাজ্যপাল আবার আজ মুখ্যমন্ত্রীকে একটা চার পাতার চিঠি পাঠিয়েছেন। আবার দিলীপ ঘোষও আজ মুখ্যমন্ত্রীকে একটা চিঠি লিখেছেন। তাঁদের চিঠির টোন এবং ভাষা কী হতে পারে, তা এতদিনে সকলে জেনে গিয়েছেন। তাই এই ডায়েরিতে বিস্তারে গেলাম না। কিন্তু এটা ক্রমশই একটা বোকা–বোকা জায়গায় পৌঁছচ্ছে।

সন্ধ্যা ৬.‌০০

মুখ্যসচিব নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে জানাচ্ছেন, রাজ্যে করোনা আক্রান্ত হয়ে মৃত এখনও পর্যন্ত ৬১ জন। নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন ৬১ জন। এখনও পর্যন্ত রাজ্যে মোট আক্রান্তের সংখ্যা ১,২৫৯। সংক্রমণ–মুক্ত ২১৮ জন।

কেন্দ্রীয় প্রতিনিধিদলের চিঠি নিয়ে প্রশ্ন শুনে তিনি বললেন, ‘যতবারই ওঁরা আমায় চিঠি লেখেন, দেখেছি তার ঘন্টাদুয়েক আগে সেটা আপনাদের কাছে পৌঁছে যায়।’

সন্ধ্যা ৬.‌২৮

ইস্ট দিল্লির সব লিকার শপ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে দিল্লি পুলিশ। এটাই হওয়ার ছিল। দোকান খোলামাত্রই হাঘরের মতো গিয়ে হামলে পড়লে এই–ই হয়। অনেকদিন আগে এক বর্ষীয়ান মাতালের আপ্তবাক্য মনে পড়ে গেল। অফিসের গেট টুগেদারে এক সহকর্মী মদ খেয়ে বেহদ্দ মাতাল হয়ে বমি–টমি করে ছড়িয়ে ফেলেছিল। সেদিন কোনওমতে তাকে অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি পৌঁছে দেওয়া হয়। দু’দিন বাড়িতে থেকে ধাতস্থ হয়ে জয়েন করার পর সিনিয়র সহকর্মী বলেছিলেন, ‘আরাম সে পিও বেটা। সারি জিন্দেগি পিনা হ্যায়। হ্যায় কি নহি?‌ তো বরখুরদার, যব ভি পিও, আরাম সে পিও।’

এঁরা সব নমস্য ব্যক্তি। আজকাল আর এঁদের দেখা পাওয়া যায় না। মদ্যপদেরও জাত গিয়াছে।

সন্ধ্যা ৭.‌৪২

মিঠু ফেসবুকে স্টেটাস দিয়েছে ‘অর্থনীতি চাঙ্গা করা এখন মাতালদের দায়িত্ব। ওদের সম্মান করতে শিখুন’। দেখে ভাল লাগল যে, এই কঠিন সময়েও আমার বাল্যবন্ধু আত্মসম্মানজ্ঞানটা টনটনে রেখেছে। ওর সেন্স অফ হিউমার চিরকালীন। সঙ্কটসময়ে সেটা না হারানো দৃষ্টান্তযোগ্য।

রাত ৮.‌৩২

পশ্চিমবঙ্গে কনটেনমেন্ট জোন বেড়ে হল ৫১৬টি। এর মধ্যে কলকাতায় ২৬৪টি থেকে বেড়ে কনটেনমেন্ট জোনের সংখ্যা হয়েছে ৩১৮টি। উত্তর ২৪ পরগনায় কনটেনমেন্ট জোন ৮১টি, হাওড়ায় ৭৪টি, হুগলিতে ১৮টি, নদিয়ায় ২টি, পূর্ব মেদিনীপুরে ৯টি, পশ্চিম মেদিনীপুরে ৫টি, পূর্ব বর্ধমানে ১টি, মালদায় ৩টি, দার্জিলিংয়ে ২টি, কালিম্পংয়ে ১টি এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ১টি। রাজ্যের বাকি ৯টি জেলায় কোনও কনটেনমেন্ট জোন নেই।

এইসমস্ত জোনে কাউকে ঢুকতে বা বেরোতে দেওয়া হবে না। এটা লিখতে লিখতে মনে হচ্ছে এখন আর রেড, অরেঞ্জ বা গ্রিন জোন নেই। এখন জোন শুধু একটাই— কনটেনমেন্ট জোন।

১০.‌৩৩

লকডাউনে আরও একটা দিন কাটল। প্রায় রোজই ঘুমোতে যাই জীবনের বিভিন্ন গ্লানি আর অপ্রাপ্তি নিয়ে। আজ শোওয়ার সময় বেডসাইড টেবিলে হলদে আলোর পাশে এই অকিঞ্চিৎকর জীবনের উজ্জ্বল প্রাপ্তি সযত্নে রেখে দিলাম।

#মেন্টরফরএভার

লকডাউন ডায়েরি – ৩ মে, ২০২০

০৩.‌০৫.‌২০২০

সকাল ৮.‌৪৫

রোজ রাতে অফিস থেকে ফিরে শেষবারের মতো কনুই পর্যন্ত সাবান দিয়ে হাত ধুই। ফোন স্যানিটাইজ করি। ভাল করে পা ধুই। টি–শার্ট আর ট্রাউজার্স পরদিন কাচার জন্য ভিজিয়ে দিই। পরপর। যন্ত্রের মতো। এটাই এখন রুটিন। ভালই বোধহয়। নাকি বোরিং?‌ জানি না। জীবনটা স্যানিটাইজার–সর্বস্ব হয়ে গেল। হেল্‌থ–হাইজিন তো অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এতটা বাড়াবাড়িও কি ভাল?‌ এরপর তো বলবে, সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্টের আগে আর বিকেলে চা খাওয়ার পর এক চামচ করে ডেটল খেতে!‌

সকাল ১০.‌১০

আকাশ কাঁপিয়ে একটা হেলিকপ্টার উড়ে গেল। বেশ নীচু দিয়ে। একঝলক দেখে মনে হল এমআই–১৬। যেমন বায়ুসেনায় ব্যবহার করা হয়। কিন্তু হেলিকপ্টার কেন?‌ ত্রাণ নিয়ে যাচ্ছে নাকি?‌ বহুদিন পর এত কাছ থেকে একটা অন্তরীক্ষযান দেখলাম। আওয়াজ পেয়েই ওয়ার্কআউট করতে করতে দৌড়ে বারান্দায় গিয়েছিলাম। রেলিং ধরে হাঁ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। যতক্ষণ না কপ্টারটা মেঘের আড়ালে মিলিয়ে গেল। তারপরেও অনেকক্ষণ কান পেতে রইলাম, যতক্ষণ তার অতিকায় রোটর ব্লেডের আওয়াজ দিগন্তে মিলিয়ে যায়।

২০১১ সালের ভোটের প্রচারে তদানীন্তন হবু মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে গোটা রাজ্যের আকাশে হেলিকপ্টারে ঘোরার অভিজ্ঞতা আছে। কিন্তু সেসব ভদ্র কপ্টার। প্রথমে ছিল একটা বড় হেলিকপ্টার। সেটা বিকল হয়ে যাওয়ায় দিল্লি থেকে এসে পৌঁছল পবনহংসের একটা পুঁচকে, মিষ্টি এবং বাহারি কপ্টার। এয়ারকন্ডিশন্‌ড। ভিতরে চাইলে কথা বলা যায়। হেডফোন লাগে না। কিন্তু বায়ুসেনার অতিকায় এমআই–১৬ ইজ আ ডিফারেন্ট বলগেম। আর এমআই–১৬ মানেই আন্দামান আর পোর্ট ব্লেয়ার।

২০০৫ সালের ডিসেম্বরে সুনামির একবছর পূর্তি। সুনামির কভারেজে গিয়েছিলাম দক্ষিণ ভারতে। বর্ষপূর্তিতে ঠিক হল, প্রথমে আন্দামান–নিকোবর ঘুরে তারপর যাব দক্ষিণ ভারতে। সিরিজ লিখতে। বিষয়:‌ একবছর পর সুনামির ক্ষত কতটা নিরাময় হল।

এখন কী হয়েছে জানি না। বহুদিন প্লেনে চড়াও হয় না। বন্ধুবান্ধব প্রশ্ন করলে খুব সিরিয়াস মুখ করে বলি, পাসপোর্ট ইমপাউন্ডেড হয়ে গিয়েছে। তাই প্লেনে ওঠা বারণ। তারা অবাক হয়ে প্রশ্ন করে, পাসপোর্ট কেন বাজেয়াপ্ত হল?‌ আরও গম্ভীর হয়ে বলি, সেসব অনেক গূহ্য কথা। পাবলিকলি বলা যাবে না। যাকগে। কিন্তু তখন কলকাতা থেকে দিনের প্রথম উড়ানটাই ছিল পোর্টব্লেয়ারের। সকাল সকাল এয়ারপোর্টে নেমে হোটেলে গিয়ে দেখলাম, সেখানে আগে থেকেই মজুত ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’এর সুব্রত নাগচৌধুরী, ‘টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়া‘র শৈবাল সেন আর ‘দ্য টেলিগ্রাফ’এর রিপোর্টার বাপ্পা মজুমদার এবং ফটোগ্রাফার প্রদীপ সান্যাল। ওদের কাছে যা জানলাম, সে এক কেলেঙ্কারি!‌ পোর্টব্লেয়ার থেকে একেকটা সুনামি–বিধ্বস্ত দ্বীপে যেতে জলপথে লাগে ৫৬ থেকে ৭০ ঘন্টা!‌ অতদিন ধরে ট্রাভেল করলে কপি ফাইল করা হবে কী করে?‌ আর আন্দামানে নামলেই তো মোবাইলটা পেপারওয়েট হয়ে যায়। কারণ, সেখানে কোনও বেসরকারি সার্ভিস প্রোভাইডার কাজ করে না। ভরসা একমাত্র ভিএসএনএল। তার উপর ভরসা করে কি আর কপি পাঠানোর রিস্ক নেওয়া যায়?‌ তা–ও আবার বঙ্গোপসাগরের বুক থেকে?‌

কী করি?‌ কী করি?‌

ব্ল্যাকে একটা ভিএসএনএল সিম যোগাড় করে রাতের দিকে কপাল ঠুকে ফোন লাগালাম ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রীকে। কয়েকটা রিং হওয়ার পর ভেসে এল প্রণব মুখোপাধ্যায়ের পরিচিত গলা, ‘হেলু। বল।’

— দাদা, আপনার কাছে কোনওদিন কোনও সাহায্য চাইনি। কিন্তু এখন একটা বিপদে পড়ে ফোন করছি। সুনামির অ্যানিভার্সারি কভারেজে এসে পোর্টব্লেয়ারে স্ট্র্যান্ডেড হয়ে আছি। বোটে করে দ্বীপগুলোয় যেতে দু’দিন, তিনদিন লাগবে। ডেসপ্যাচ পাঠাতে পারব না। আই নিড এয়ারলিফ্‌ট।

দিল্লির তালকাটোরা রোডের বাড়ি থেকে অভয়বাণী এল, ‘তোর এই নম্বরে আধঘন্টার মধ্যে একজন ফোন করবে। যা দরকার তাকে বলে দিস। অল দ্য বেস্ট!‌’

দম ধরে বসে রইলাম। আধঘন্টা নয়, ১৫ মিনিটে দিল্লির ল্যান্ডলাইন নম্বর ভেসে উঠল স্ক্রিনে। ভারতীয় বায়ুসেনার তৎকালীন এয়ার ভাইস মার্শাল বললেন, ‘গুড ইভনিং স্যার। অনারেব্‌ল ডিফেন্স মিনিস্টার হ্যাজ ব্রিফড মি। কাল সকালে পোর্টব্লেয়ার এয়ারবেসে চলে যান। সেখানে একটা এমআই–১৬ হেলিকপ্টার আর একটা ডর্নিয়ার এয়ারক্রাফ্‌ট থাকবে আপনার জন্য। আমি এখনই মেসেজ পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

ফোন ছেড়ে সকলকে কেসটা বললাম। সুব্রত’দা বলল, ‘আমি তো অনেক আগে এসেছি। আমার দ্বীপগুলোয় ঘোরা হয়ে গিয়েছে। আমি কলকাতায় ফিরে সিরিজ লিখব।’ আর ভ্যাটকানো মুখে বাপ্পা, শৈবাল, প্রদীপ বলল, ‘তোমার তো হিল্লে হয়ে গেল। আমাদের যে কী হবে‌‌!‌’

ওদের সটান বললাম, ‘আমি একা যাব না। তোদের সকলকে নিয়ে যাব। তোদের কলম তোদের। আমার কলম আমার। যে যার মতো লিখব। দেখা যাক না তোরা কী লিখিস আর আমি কী লিখি!’ পরদিন সকালে বিশেষ জ্যাকেটে সজ্জিত আমাদের চারজনকে নিয়ে আন্দামানের আকাশে উড়ল অতিকায় এমআই–১৬। এবং তারপর আরও তিনদিন। বাকি দু’দিন ডর্নিয়ারে। কে কী লিখেছিলাম, সেটা খবরের কাগজের ইতিহাসের মহাফেজখানায় রাখা আছে নিশ্চয়ই। কিন্তু সেই প্রথম দানবীয় এমআই–১৬ কপ্টারে চড়া। সেই শেষ।

বাড়ির উপর দিয়ে সেই দানবকে উড়ে যেতে দেখে ঝপ করে ১৫ বছর আগের কথা মনে পড়ে গেল। একইসঙ্গে মনে হল পাশে একটা অপু থাকলে বলতাম, করোনা সেরে গেলে আমাকে একদিন হেলিকপ্টারে চড়াবি?‌

বেলা ১১.‌২৫

অনেকক্ষণ ধরে বাইরে একটা যান্ত্রিক আওয়াজ হচ্ছে। থামছেই না। ঘর ‘মপ’ করতে করতে শুনছিলাম। কৌতূহল হওয়ায় আবার বারান্দায় গিয়ে দেখলাম, কাছের পার্কে দু’জন মহাকাশচারী নেমেছে। চমক লাগল!‌ আজ সকাল থেকে টেরিফিক গরম পড়েছে। ঝালাপালা অবস্থা। হ্যালুসিনেট করছি না তো গরমের চোটে?‌

কিছুক্ষণ ঠাহর করে বুঝলাম, ওঁরা আসলে গরিবের পিপিই পরা পুরকর্মী। স্প্রিঙ্কলার থেকে প্রাণপণে জীবাণুনাশক ছড়াচ্ছেন চারদিকে। সেই মেশিনের আওয়াজটাই কানে আসছিল। ভাবলাম, আমাদের বাড়ির দিকে এলে একটু মন দিয়ে দেখব। যদি আলাপ করা যায়। কিন্তু দু’জনই অন্যদিকে চলে গেলেন। ধুস!‌

দুপুর ১.‌০৫

অসমসাহসিক একটা কাজ করেছি। ট্রিমার দিয়ে মাথার দু’পাশের চুল প্রায় ন্যাড়া করে ফেলেছি। দাড়ি রাখার সময় ট্রিমারটা কিনেছিলাম। সেলুনে যাওয়ার সময় না পেলে নিজেই ট্রিম করে নিতাম। আজ সেই স্কিলটাই কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছি। দু’পাশ আর সামনেটা মন্দ হয়নি। দিব্যি হাওয়া খেলছে। হাল্কা হাল্কা লাগছে। কিন্তু পিছনটা বোধহয় গুবলেট হয়ে গেল। মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আয়নায় যা দেখলাম, তাতে মনে হচ্ছে খাবলা খাবলা হয়ে আছে। কেরদানি দেখানোটা বোধহয় উচিত হল না। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই। যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। মরুক গে। না হয় কয়েকদিন টুপি পরে থাকব!‌ এখন বেরিয়ে চেতলা যেতে হবে। ইনস্টুর শরীরটা খারাপ।

দুপুর ২.‌০০

ডাক্তার ব্যানার্জির ওষুধে ইনস্টু একটু বেটার। কিন্তু কিছুতেই ছাড়তে চাইছিল না। লবঙ্গও। ওর সঙ্গে আজ একটু নোজি–নোজি খেলেছি। যদিও আমার নাক মুখোশে ঢাকা ছিল। এরা এত ভদ্র বাচ্চা যে কী বলব!‌ আর কী ‌ভাল যে বাসতে পারে! অ্যাবসোলিউট অ্যান্ড আনকন্ডিশনাল লাভ। এ জিনিস অধিকাংশ মানুষই দিতে পারে না। বেড়ালও নয়। কারণ, দেখলাম বঙ্কু আজও আমায় কমপ্লিট ইগনোর দিল। একটু ধাওয়া করেই কোলে নিলাম। ছটফটিয়ে উঠল। থাকতেই চাইছিল না। এরপর আমি ওকে পাত্তা না দিলে বুঝতে পারবে। লকডাউনটা যাক তারপর হচ্ছে ওর!‌

দুপুর ৩.‌৪০

রাস্তার পাশে ফলের গাড়ি নিয়ে পসরা বসেছে দেখে থেমেছিলাম। বাবা–মায়ের ফল আজই শেষ হয়ে যাচ্ছে। মনে হল কিনে নিই। ফলওয়ালার ডানবাহুতে উল্কি দিয়ে লেখা ‘কমল’। তোমার নাম?‌ মলিন শার্ট–ট্রাউজার্সের যুবক বলল, ‘নাহ্‌, আমার বন্ধুর নাম। বন্ধু গ্রামের বাড়িতে থাকে।’

শুনে এত অবাক হলাম যে, কেন লিখেছে প্রশ্ন করতেও ভুলে গেলাম। ট্যাটু বা উল্কি করানো নিয়ে বরাবর একটা ভীতি আছে। শুনেছি বেদম ব্যথা লাগে। ব্যক্তিগতভাবে মনে করি, যারা ট্যাটু করায় তারা সাহসের জন্য পরমবীরচক্র পেতে পারে। কিন্তু বন্ধুর নাম হাতে উল্কি করে রেখেছে কেউ, এটা প্রথম দেখলাম। সাধারণত, স্ত্রী, বান্ধবী স্বামী কিম্বা পার্টনারের নাম লেখায় লোকে। ঠাকুরদেবতা বা অন্যকিছুর ছবি–টবিও উল্কি করায়। কমল কি ওর পার্টনার?

ফলওয়ালাকে প্রশ্ন করলাম, নাম কী তোমার?‌

— জগদীশ।

তুমি কি জানো তোমার নামে একটা বিখ্যাত লাইন আছে?— ‘তুমি যা জিনিস, জানে জগদীশ’।

মাস্কের আড়ালে জগদীশ হাসল। ভারী মিষ্টি, সরল এবং নিরপরাধ হাসি। সময় ছিল না। অফিসে পৌঁছনোর তাড়া ছিল। নইলে কমলের বন্ধুকে একটু কাল্টিভেট করা যেত।

বিকেল ৪.‌৪০

অফিসে ঢুকতেই হইহই কাণ্ড!‌ আমার হেয়ারকাট নিয়ে। পিছনটা যে ভালরকম ঘেঁটেছি বুঝতে পারলাম। কিন্তু অ্যাজ ইফ কিছুই হয়নি মার্কা মুখ করে ঘুরছি। বুদ্ধি করে ট্রিমারটা নিয়ে এসেছি। গাড়িতে আছে। শুনে শুভা’দা বললেন, রাতে পেজ ছাড়ার পর পিছনটা ট্রিম করে দেবেন। দেখা যাক।

হেলিকপ্টার রহস্য ভেদ হল। করোনা যোদ্ধাদের সম্মান জানাতে দেশজুড়ে আজ বিভিন্ন হাসপাতালের উপর পুষ্পবৃষ্টি করা হয়েছে। আমি যেটা দেখেছিলাম, সেটা রাজারহাটের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পুষ্পবৃষ্টি করে উড়ে যাচ্ছিল।

কাল মুম্বইয়ের বাড়িতে ঋষি কাপুরের স্মরণসভা হয়েছে। সেখানে ছিলেন নীতু আর রণবীর। কন্যা ঋদ্ধিমা দিল্লি থেকে রওনা দিয়েছিলেন সড়কপথে। কিন্তু রাতের আগে মুম্বইয়ে পৌঁছতে পারেননি। ততক্ষণে স্মরণসভা শেষ। নীতু ইনস্টাগ্রামে প্রয়াত স্বামীর একটা ছবি দিয়েছেন। হাস্যমুখ ঋষি হাতে হুইস্কির গ্লাস নিয়ে। নীতু লিখেছেন, ‘এন্ড অফ আওয়ার স্টোরি’। সেটা ফেসবুকে শেয়ার করে দেখলাম অয়ন লিখেছে, ‘ সুতপা একটা দীর্ঘ পোস্ট দিয়েছিলেন, নীতু অল্প চারটে শব্দ। গভীরতা সমান। বিউটি অফ লাইফ। এমব্রেস অ্যাজ ইট কামস।’

সন্ধ্যা ৭.‌১০

রাজ্যপাল এবার দূরদর্শনে ভাষণ দিলেন। টুইট, সাংবাদিক বৈঠক, চিঠির পর এবার সরাসরি ভাষণ। যেখানে তিনি বলেছেন, রেশন নিয়ে রাজনীতি হচ্ছে। ওই খাদ্যশস্য কেন্দ্রীয় সরকার পাঠাচ্ছে। শাসকদল–সহ রাজ্যের কোনও রাজনৈতিক দলই সেটা নিজেদের বলে দাবি করে তা বিতরণ করতে পারে না। অর্থাৎ, পরোক্ষে আবার রাজ্য সরকারকে লক্ষ্য করে গোলাবর্ষণ।

তবে শুনলাম, রাজ্য সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না। এক মন্ত্রীকে ফোন করেছিলাম। বললেন, ‘ধুস, ফালতু।’ মনে হচ্ছে, মুখ্যমন্ত্রীও তেমনই মনে করছেন— ফালতু!‌

সন্ধ্যা ৭.‌৩৭

কাল থেকে মদের দোকান খুলছে। সেটা তো ঠিকই ছিল। দিকে দিকে খুশির হাওয়া। শুনছি হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপে বিশাল আলোচনা চলছে। কলকাতায় কোন কোন দোকান খোলা থাকবে, তার লিস্ট চালাচালি হচ্ছে। যা অবস্থা, তাতে ল অ্যান্ড অর্ডার প্রবলেম না হয়!‌ দীপাঞ্জন একটা হোয়াট্‌সঅ্যাপ পাঠিয়েছে। দেখে মনে মনেই হাসছিলাম— ‘কাল ওয়াইন শপ খোলার আগে ভারত সরকার একটি হৃদয়স্পর্শী আবেদন করেছে। সকলে মদ্যপান করে সোজা বাড়ি যান। কেউ আবার চিনের সঙ্গে যুদ্ধ করতে চলে যাবেন না’!‌

রাত ১০.‌০৬

কাগজ ছাড়ার পর গাড়ি থেকে ট্রিমার নিয়ে এলাম। তারপর বারান্দায় খবরের কাগজের জামা পরে বাধ্য ছেলে হয়ে বসলাম। দন্তরুচির পর শুভা’দা আবার দেবদূতের ভূমিকায় অবতীর্ণ। এবার ট্রিমার হাতে। ট্রিমারের প্রভূত প্রশংসা–সহ পিছনটা মিলিয়ে দিলেন। দেবাশিস আবার পুরোটা ভিডিও করে রেখেছে। পরে নাকি ফেসবুকে শেয়ার করবে। ও ইদানীং বেজায় ভাল অডিও–ভিস্যুয়াল বানাচ্ছে। ইরফানকে নিয়ে একটা অসামান্য ট্রিবিউট তৈরি করেছে। সেটা আজকাল অনলাইন শেয়ারও করেছে। দেবাশিসকে বললাম ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক–টিউজিক দিয়ে একটা শর্ট ফিল্ম মতো করতে।

ছবির নায়ক— চুলবুল পান্ডে।

‌‌

লকডাউন ডায়েরি – ২ মে, ২০২০

০২.‌০৫.‌২০২০। শনিবার

বেলা ১১.‌০৬

ইংলিশ ওয়েদারের ঠেলায় সারা রাত ফ্যানের রেগুলেটর বাড়াতে–কমাতেই কেটে গেল। ফলে ঘুম ভাঙল সাড়ে ৮টায়। অ্যালার্ম দিতেও ভুলে গিয়েছিলাম। ধড়মড়িয়ে যখন উঠলাম, বাইরে বেশ কড়া রোদ্দুর। সেই রোদ্দুরই রায় দিলেন, এবার উঠে পড়ুন। আর বিছানায় সাঁতার কাটবেন না।

বাবা–মা’কে চা ইত্যাদি দিয়ে ওয়ার্কআউট শুরু করতে করতে সাড়ে ৯টা। তারপর খানিক ঝাঁপিয়ে, খানিক হাঁপিয়ে সাড়ে ১০টা নাগাদ ম্যাট–শয্যা নিয়েছিলাম। একটু আগে উঠে খানিক ধাতস্থ হয়ে আজকের প্রথম এন্ট্রি করতে বসেছি। দেশ–দুনিয়ায় কি অনেককিছু ঘটে গিয়েছে ইতিমধ্যে?‌

বেলা ১১.‌৫৪

আজ সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিন। জন্মশতবর্ষ। সকালে দেখলাম, আমার ফেসবুক পেজের অ্যাডমিনরা সত্যজিৎকে লেখা ‘খোলা চিঠি–ইতি অনিন্দ্য’ পেজে আবার শেয়ার করেছে। তাই আমিও ফেসবুকে পোস্ট করে দিলাম চিঠিটা। একবছর আগে এটা লিখেছিলাম। ভাবছি আরেকবার পড়ে দেখব। এমনিতে নিজের কোনও লেখাই প্রকাশিত হওয়ার পর পড়ি না। কারণ, সবসময় মনে হয়, আরও ভাল লেখা যেত। আফশোস হয়। কিন্তু এই লেখাটা আবার পড়ে দেখতে ইচ্ছে করছে।

দুপুর ১২.‌০৬

পড়লাম। দেখলাম, মন্দ লিখিনি। চলে যায়।

তপশ্রী’দি নিজের টাইমলাইনে একটা ছবি পোস্ট করেছেন। একটা রিকশার পাদানিতে থরে থরে ম্যাগির প্যাকেট সাজানো বাক্স রাখা। লিখেছেন, ‘বদলে যাচ্ছে অর্থনীতি। পেটের টানে খড়কুটো আঁকড়ে ধরছে শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাওয়ালা ম্যাগি ফেরি করছে পাড়ায় পাড়ায়’। এই কথাটা লকডাউন শুরুর সময়েই মনে হয়েছিল যে, এরপর পেশা বদলে যাবে মানুষের। এখন দেখা যাচ্ছে, সেটা সত্যিই ঘটতে শুরু করেছে। একটা মিশ্র অনুভূতি হল। একদিকে মনে হল, এই দিন–আনা দিন–খাওয়া লোকগুলোর বড় দুর্দশা। দিন চালানোই দুষ্কর। অন্যদিকে মনে হল, তা–ও তো গ্রাসাচ্ছাদনের একটা উপায় বেরিয়েছে। লড়াইয়ের একটা রাস্তা বেরিয়েছে। দিনের শেষে জীবনধারণের জন্য মানুষ সব পারে।

দুপুর ১২.‌৫২

একটা মাস চলে গেল। আবার মায়ের পেনশন তোলার সময় আসছে। ভাবছি, পেনশনটা তুলে এনে মা’কে বলব, প্রচুর পরিশ্রম যাচ্ছে। এবার মাইনে দাও। কথাটা ভেবে নিজের মনে খুব একচোট হাসতে হাসতেই আরেক ‘মা’ হাজির হলেন হোয়াট্‌সঅ্যাপে পাঠানো পোস্টারে। ইনি ‘মা’ বটে। তবে ‘জ্যাক’। জ্যাক মা।

ধনকুবের আলিবাবা গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেছেন,‘যাঁরা ব্যবসা করেন তাঁদের কাছে ২০২০ সালটা স্রেফ কোনওমতে নিজেদের প্রাণটা বাঁচানোর বছর। ভুলেও নিজের স্বপ্ন বা পরিকল্পনার কথা উচ্চারণ করবেন না। স্রেফ প্রাণে বেঁচে থাকাটা নিশ্চিত করুন। বেঁচে থাকলেই মনে করবেন ইতিমধ্যে লাভ করে ফেলেছেন।’ এই বেদবাক্য অবশ্য আমি এবং আরও অনেকে উচ্চারণ করতে পারি। কিন্তু আমরা তো আর পৃথিবীর ‘মা’, থুড়ি জ্যাক মা নই।

দুপুর ১.‌‌৪৬

আমেরিকায় মৃত আপাতত ৬৪ হাজার ৮০৪ জন। আপাতত। এর মধ্যেই আজ কেমডিভির ব্যবহারে ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। ট্রাম্পের কিন্তু পাগল–পাগল অবস্থা এখন। মনে হচ্ছে, সামনে কাউকে দেখলেই কামড়ে দেবে!‌

পাকিস্তানে মৃত ৪০২ জন। ভারতে আজ পর্যন্ত মৃত ১,২১৮ জন। আক্রান্ত ৩৭ হাজার ৩১৭ জন।

দুপুর ২.‌০৪

লকডাউনে আটক শ্রমিকদের বাড়ি ফেরাতে আজ দেশের বিভিন্ন রাজ্য থেকে ‘শ্রমিক স্পেশাল’ ট্রেন চালু হল। এমনই একটা ট্রেন রাজস্থানের আজমীড় শরিফ থেকে কাল কলকাতা স্টেশনের দিকে রওনা দেবে। তবে ক’টার সময়, তা এখনও ঠিক হয়নি। প্রসঙ্গত, রাজস্থানের কোটায় আটক পড়ুয়াদের কলকাতায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে।

পরিযায়ী শ্রমিকরা মূলত বাংলা, বিহার এবং উত্তরপ্রদেশ থেকেই রুজির ধান্দায় বিভিন্ন রাজ্যে যান। লকডাউনে আটকে থেকে এতদিনে তাঁরা বাড়ি ফিরছেন। আজকেই রাজস্থানের জয়পুর থেকে বিহারের দানাপুরে ফিরেছেন একঝাঁক শ্রমিক। প্ল্যাটফর্মে নেমে তাঁরা আঙুল তুলে ‘ভি’ চিহ্ন দেখিয়েছেন। পিটিআই ছবিটা পাঠিয়েছে। সেটাই পেজ ওয়ানে নিলাম।

ওই ছবিটা দেখেও একটা মিশ্র ভাবনা তৈরি হল। একদিকে মনে হল, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য এটা ভালই হল। সকলে ভিটেয় ফিরে আসবেন। আত্মীয়–পরিজনদের আশ্রয়ে। কিন্তু অন্যদিকে আবার মনে হল, এঁরা ঘরে ফিরেও তো কোনও কাজ পাবেন না। এঁদের মধ্যে অনেকে বিশেষ স্কিলসম্পন্ন। তাঁরা কি লকডাউন মিটলেও আর ভিনরাজ্যে পাড়ি দেবেন? সেক্ষেত্রে তাঁদের স্কিলগুলো ওইসব রাজ্যের লোকদের শিখতে হবে। ততদিন কি ওইসব রাজ্যে কাজ বন্ধ থাকবে?‌ আরও প্রশ্ন:‌ স্টেশনে না হয় পুলিশি প্রহরায় গোল গোল সাদা দাগের মধ্যে বসিয়ে তাঁদের মধ্যে দৈহিক ব্যবধান বজায় রেখে ট্রেনে তুলে দেওয়া হল। ট্রেন ছাড়ার সময় রেলপুলিশের কর্তারা দাঁড়িয়ে একযোগে হাততালিও দিলেন। কিন্তু ট্রেনের দীর্ঘ যাত্রাপথে কি তাঁদের মধ্যে সেই ব্যবধান বজায় থাকবে?‌ বাড়িতে ফেরার পর তাঁদের জন্য কি কোনও স্যানিটাইজেশনের ব্যবস্থা থাকবে?‌ ঠিক জানি না। তবে এই বিপুল জনসংখ্যার দেশে এসব প্রশ্নের জবাব কারই বা জানা থাকে!‌

রাজ্যপাল আর কল্যাণ’দার আবার লেগেছে। রাজ্যপাল সকালে টুইট করেছিলেন, রাজ্য সরকার করোনায় মৃতের সংখ্যা গোপন করছে। সেই টুইটে তিনি মুখ্যমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘আপনি বলেছিলেন, বিরোধী দলগুলো মৃতদেহের জন্য শকুনের মতো বসে রয়েছে। এই মন্তব্য প্রত্যাহার করুন!‌’ কল্যাণ’দা দেখলাম তার জবাবে টিভি–তে বলছে, ‘ওঁর একমাত্র টার্গেট মমতা ব্যানার্জি। হি ইজ দ্য প্রাইম ভায়োলেটর অফ দ্য কনস্টিটিউশন।’

রেশনের গুবলুটা কি ক্রমশ ছড়াচ্ছে?‌ জেলায় জেলায় বিক্ষোভ, অশান্তি, ভাঙচুর। কোথাও কোথাও ডিলারের বাড়িতে আগুনও লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এই অরাজকতাকে কীভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যাবে কে জানে!‌ কলকাতার মেয়র বলছেন, ‘সব তো একদিনে হবে না। একটু ধৈর্য ধরতে হবে। কিন্তু রেশন ব্যবস্থাটা ঠিকঠাকই চালু রয়েছে। আমি কলকাতার চারদিকে ঘুরে তো সেটাই দেখলাম।’

দুপুর ২.১৪

‘নিউজ ১৮’ একটা ভাল স্টোরি করেছে। পাড়ায় পাড়ায় ম্যাজিক দেখিয়ে বেড়ানো যাদুকরদের নিয়ে। তাঁদের রুজি–রোজগার এখন পুরোপুরি ডকে উঠেছে। চমৎকার আইডিয়া। সত্যিই তো। উঁচুদরের বিনোদনশিল্পীরা তা–ও সঞ্চয় ভাঙিয়ে কিছুদিন টানতে পারবেন। এঁদের কী হবে?‌ সকলেই তো আর পিসি সরকার (‌জুনিয়র)‌ নন। নিয়তির কী পরিহাস, এই দুর্বিসহ অবস্থা থেকে বেরোনর জন্য কোনও ম্যাজিক কাজ করবে না। এটা বাস্তব। এখানে পরাবাস্তবতার কোনও জায়গা নেই।

দুপুর ২.২৪

লকডাউন ডায়েরি পড়ে ভাল লাগে জানাতে দিল্লি থেকে লম্বা হোয়াট্‌সঅ্যাপ পাঠিয়েছেন আমার নেমসেক। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় দিল্লির ‘টাইম্‌স অফ ইন্ডিয়া’য় কাজ করেন। একটা সময় ওঁকে ‘এবেলা’য় নেওয়ার কথা হয়েছিল। তারপর বিভিন্ন কার্যকারণে তা আর হয়ে ওঠেনি। লকডাউনে কল–কারখানা বন্ধ হয়ে দূষণ কমায় যমুনার জল আবার নীল হয়ে গিয়েছে, এমন একটা ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছিল। সেটি তুলেছিলেন এই অনিন্দ্য।

‘খোলা চিঠি–ইতি অনিন্দ্য’র আদলে ‘লকডাউনেষু’ সম্বোধন করে এই অনিন্দ্য লিখেছেন, কলকাতায় ফ্রিল্যান্স করার সময় একদিন তাঁর এক বন্ধু এই অধমকে দেখিয়ে দিয়েছিলেন। তার পরের বাক্যটা খুবই এমব্যারাসিং— ‘সেদিন থেকে দুই কলার তুলে চলা মানুষকে শ্রদ্ধা করি। এক আপনি আর অন্যজন আজহারউদ্দিন। আসলে কলার তুলে চলাটা মানায় আপনাদের।’ অনিন্দ্যকে বলা হল না যে, আমার টি–শার্টের কলার তুলে রাখাটা ছিল একটাই কারণে। আমি এমনিতেই কালোমানিক। তারপর ঘুরে ঘুরে রিপোর্টিং করার সময় ঘাড়ে রোদ লেগে সেটা ঘোরতর কৃষ্ণবর্ণ ধারণ করত। ঘাড় বাঁচাতেই কলার তুলে রাখা। তাছাড়া আর কোনও কারণ নেই। তবে আমার সেই ‘কলার তোলা ঔদ্ধত্য’ নিয়ে যুগে যুগে, কালে কালে চারদিকে এমন ক্ষোভ এবং অবিমিশ্র অসূয়ার ঢেউ ওঠা শুরু হল যে, গত কয়েকবছর টি–শার্ট কিনেই প্রথমে কাঁচি দিয়ে কলারটা কেটে নিই। যাতে এ নিয়ে আর অন্য কারও অ্যাসিডিটি না হয়। ঘাড় এখন খোলাই থাকে। যে কেউ ইচ্ছে করলেই এসে কোপ মেরে যেতে পারে।

নেমসেককে জবাব দিলাম, আপনার তোলা নীল যমুনার ছবিটি চমৎকার হয়েছিল।

উত্তর এল, ‘যমুনার লকডাউন প্রাপ্তি’।

দুপুর ২.‌৩৭

অবশেষে ‘আরোগ্যসেতু’ অ্যাপ ডাউনলোড করলাম। জিনিসটা কিন্তু কাজের হয়েছে। অ্যাপে যা দেখছি, তাতে আমার সল্টলেকের বাড়ির ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনও কোভিড আক্রান্ত নেই। কিন্তু ১ কিলোমিটারের মধ্যে ১ জন, ২ কিলোমিটারের মধ্যে ৩ জন, ৫ কিলোমিটারের মধ্যে ১৭ জন এবং ১০ কিলোমিটারের মধ্যে ৭৮ জন কোভিড আক্রান্ত রয়েছেন। দেখে মনে হল, ভাগ্যিস বাসন্তী’দিকে আপাতত আসতে নিষেধ করেছি!‌

তবে এই অ্যাপেও একটা ক্যাচ আছে। যাঁরা অ্যাপ ব্যবহার করছেন, তাঁদের কাছে তাঁদের সম্পর্কেই কয়েকটা তথ্য চাওয়া হচ্ছে। সেগুলো যদি কেউ ঠিকঠাক না বলেন (‌যেমন তিনি গত ১৪ দিনে বিদেশ থেকে এসেছেন কিনা বা তাঁর বয়স, সাম্প্রতিক অসুস্থতা ইত্যাদি)‌, তাহলে পুরো প্রসেসটাই বৃথা। অ্যাপটা দেখে মনে হল, কেন্দ্রীয় সরকার সারা দেশের জন্য একটা কোভিড ম্যাপ তৈরি করতে চাইছে। সেটা কিন্তু মন্দ প্রচেষ্টা নয়। ভবিষ্যতের জন্য খুব জরুরি তো বটেই।

দুপুর ৩.‌০০

বাড়ি থেকে বেরিয়েই দেখলাম চারদিকে রাস্তা সাদা হয়ে আছে। মাস্ক ভেদ করে নাকে এল ব্লিচিং পাউডারের ঝাঁঝালো গন্ধ। এই এলাকাটায় কয়েকটা ছোটবড় হাসপাতাল আছে। সম্ভবত সেই কারণেই। কাল রাস্তা জুড়ে ছিল রাধাচূড়ার হলুদ পাপড়ি। আজ ব্লিচিং পাউডার। রাস্তার রং প্রতিদিন বদলে যাচ্ছে। জীবনের রংয়ের মতো।

দুপুর ৩.‌‌১৫

একটু আগে অফিসে এলাম। আসার পথে উইপ্রোর সামনে দেখলাম, একটা ধূসর রংয়ের পায়রা ঘাড় ভেঙে রাস্তায় পড়ে আছে। নিশ্চয়ই কোনও বেপরোয়া গাড়ি ধাক্কা মেরেছে! হয়তো জানেও না যে একটা প্রাণীহত্যা করে নির্বিকার চলে গিয়েছে। পায়রাটাকে দেখে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কোয়ারের কথা মনে পড়ল। আর ঝপ করে আবার মনে পড়ে গেল তার সঙ্গে জড়িত একরত্তি চেহারাটা।

তখন ফাঁক পেলেই ট্রাফালগার স্কোয়ারে গিয়ে বসে থাকতাম। সেখানে ঝাঁক ঝাঁক পায়রা। মুম্বইয়ের গেটওয়ে অফ ইণ্ডিয়ার চত্বর বা দাদারের কবুতরখানায় যেমন থাকে। স্কোয়ারের মাঝখানে একটা বিশাল ফোয়ারা। সারাদিন চলে। সেই ফোয়ারার জলে ফিরিঙ্গিরা এক একটা পেনি ছুড়ে ফেলে মানত করে। তাতে নাকি মনস্কামনা পূর্ণ হয়। স্কোয়ারের একদিকে ছোট ছোট নীল বাটিতে গমের দানা পাওয়া যায় পায়রাদের খাওয়ানোর জন্য। অল্পদামে সেই গম কিনে, হাতের তেলোয় নিয়ে দাঁড়ালে পায়রারা এসে কাঁধে–মাথায় বসে। কুট কুট করে গম খেয়ে যায় নির্বিবাদে।

ইউনিভার্সিটি থেকে প্রত্যেক স্কলারকে একটা করে এসএলআর ক্যামেরা দেওয়া হয়েছিল। সঙ্গে ফিল্ম রোল। যা খুশি ছবি তোলার জন্য। যাতে ফ্রেম দেখার বুঝটা তৈরি হয়। গুচ্ছের আবোলতাবোল ছবি তুলে বিশ্ববিদ্যালয়ের পয়সাতেই সেগুলো ডেভেলপ করাতাম। সেরা ছবিগুলো ব্যবহার করা হয়েছিল আমাদের প্রোডিউস করা একটা ম্যাগাজিনে।

ট্রাফালগার স্কোয়ার হল কলকাতার শহিদ মিনারের পাদদেশের মতো। যত রাজ্যের ভানুমতীর খেল আর ভবঘুরের আখড়া। প্লাস বিশ্ববিখ্যাত টুরিস্ট অ্যাট্রাকশন। ছবি তোলার পক্ষে যাকে বলে আদর্শ। একদিন দুপুরে সেখানে বসেছিলাম। কাছের ফোয়ারা থেকে দমকা বাতাসে ইলশেগুঁড়ি উড়ে এসে লাগছে গায়ে। চুপটি করে বসে থাকতে থাকতেই দেখলাম টকটকে লাল রংয়ের ফ্রক পরা দেবশিশুর মতো এক বালিকা ফোয়ারার জলে নামছে আর পেনি কুড়িয়ে কুড়িয়ে পায়রা খাওয়ানোর নীল বাটিতে ভরছে। বাটি ভরে গেলে ফোয়ারা থেকে উঠে কুড়োন পেনি রেখে আবার জলে নামছে আরেকটা নীল বাটি কুড়িয়ে।

শিশুটি আমার উচাটন মনে তরঙ্গ তুলল। একবার ফোয়ারা থেকে ওঠার পর হাত নেড়ে তাকে কাছে ডাকলাম। আপাদমস্তক ভেজা গায়ে পাথরের উপর জলছাপ রেখে সে এসে দাঁড়াল। সপসপে ফ্রক লেপ্টে গিয়েছে গায়ে। লন্ডনের মারুনে শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে। দাঁতে দাঁত লেগে যাচ্ছে। হাসিমুখে দু’হাত বাড়াতেই ঝাঁপিয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক যুবকের কোলে চলে এল সেই মেয়ে। দু’হাতে জড়িয়ে শরীরের ওম দিয়ে তার শীত কমানোর চেষ্টা করতে করতেই টুকটাক কথা বলছিলাম। দেখলাম দিব্যি ইংরেজি বলে। ফোকলা দাঁতে হাসতে হাসতে দেবশিশু জানাল, সে এক বসনিয়ান রিফিউজি। যুদ্ধের জন্য ঘরবাড়ি থেকে উৎখাত হওয়া বাবা–মা তাকে নিয়ে লন্ডনে এসেছে রুজির খোঁজে। এখন তারা সারাদিন নির্মাণকর্মীর কাজ করে। রাতে ফিরে আসে কাছেই কভেন্ট গার্ডেনে ফুটপাথের আস্তানায়। আর তাদের কন্যা ফোয়ারার জল থেকে পেনি কুড়োয় দিনভর।

আমার মতো নিগারের কোলে সেই উজ্জ্বল শিশুকে দেখে আশপাশের পর্যটকদের কিঞ্চিৎ কৌতূহল হয়েছিল। তাদেরই একজনের হাতে নিজের ক্যামেরা ধরিয়ে বললাম আমাদের কয়েকটা ছবি তুলে দিতে। তারপর সেই একরত্তির হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে গেলাম কাছের হটডগ স্টোরে। পেটপুরে খাইয়ে তার হাতে দিলাম বৃত্তির টাকা থেকে বাঁচানো কিছু পাউন্ড। নীল চোখ তুলে মেয়ে অবাক হয়ে তাকাল আমার দিকে।

সে চাহনি এখনও ভুলিনি। কারণ, তার সঙ্গে সেই শেষ দেখা। তারপরে বহুবার ট্রাফালগার স্কোয়ারে গিয়েছি তার খোঁজে। পাইনি।

আসল ঘটনাটা ঘটল দেশে ফিরে। ফোয়ারার ধারে তোলা সেই ছবি আমার অফিসের কিউবিক্‌লে বোর্ডপিন দিয়ে আটকে রেখেছিলাম। চারপাশে কৌতূহল বাড়তে শুরু করল। তারপর একদিন এক সহকর্মী যাবতীয় ভদ্রতা এবং লজ্জার মাথা খেয়ে প্রশ্ন করেই ফেললেন, ‘এই বাচ্চাটা কে?‌’

— আমার মেয়ে।

‘অ্যাঁ?‌ এত ফর্সা?‌’

— হ্যাঁ। সাহেববাচ্চা। লন্ডনে থাকে।

অনতিবিলম্বে চরাচরে রটে গেল, অনিন্দ্যর বিলেতে একটি ‘অবৈধ’ কন্যাসন্তান আছে। নিছক প্র্যাকটিক্যাল জোক করে বলা সেই ভ্রান্তি কোনওদিন ভাঙানোর চেষ্টা করিনি। কারণ, মনে মনে সত্যিই সেই পরীকে নিজের সন্তান বলে ভাবতাম। একুশটা বছর কেটে গিয়েছে। এখনও তাকে মিস্‌ করি। বসনিয়ার শরণার্থী সেই মেয়ে নিশ্চয়ই এখন টগবগে তরুণী। লন্ডনেই কি থাকে তারা এখনও?‌ নাকি অন্য কোথাও শিকড় গজিয়েছে তার?‌ জানি না। সেই যুবক এখন মধ্যবয়স্ক। কিন্তু এখনও কোনও যুদ্ধের ক্লাসিক ছবিতে ছিন্নমূল শরণার্থীর সারি দেখলে তার মনে পড়ে ভিজে সপসপে ফ্রক পরা সেই ডলপুতুল আর তার সমুদ্রনীল চোখের অবাক চাহনির কথা। তার মনে তার মেয়ের বয়েস আর বাড়েনি।

আজ পায়রাটাকে দেখে সেই মেয়ে আবার ভেসে এল।

বিকেল ৫.‌৩০

রাজ্যপালকে ১৩ পাতার একটি চিঠি পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। যা নিয়ে আবার রাজ্য প্রশাসন তোলপাড়। কিন্তু করোনা–ভীত বঙ্গবাসীর কি সত্যিই কিছু যায়–আসে এই পত্রযুদ্ধে?‌ জানি না।

লকডাউনের সময় দুটো অত্যাশ্চর্য কাণ্ড ঘটেছে। গাদিয়াড়ার গঙ্গায় শুশুক দেখা গিয়েছে আর সনৎ রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছে। আজ অবশ্য এসেই বলল, ‘মাস্ক পরে পরে নাক ব্যথা হয়ে যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, আমার মোবাইল ফোন আমারই ফেস ডিটেক্ট করতে পারছে না!‌’

সন্ধ্যা ৮.৩০

রাহুল গান্ধী টুইট করেছেন, আরোগ্য সেতু অ্যাপ আসলে একটা সফিস্টিকেটেড সারভিলেন্স সিস্টেম। যার দায়িত্বে একজন প্রাইভেট অপারেটর।যার উপরে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক নজরদারিও নেই। এর ফলে ডেটা সিকিউরিটি এবং ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে সিরিয়াস উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।

যার জবাবে কঙ্গনা রানাবত লিখেছেন,

– আপনি আই ফোনের সঙ্গে সব ডেটা শেয়ার করতে পারেন।

– আপনি ফেসবুক, গুগল, টুইটার টিন্ডার-সহ সব সোশ্যাল মিডিয়ায় নিজের সব ডেটা শেয়ার করতে পারেন।

অথচ, নিজের কিছু তথ্য পাবলিক সেফটির জন্য তৈরি একটা অ্যাপে শেয়ার করতে পারেন না।

দোনো মা-বেটে বহত ঘাটিয়া হ্যায়।

রাত ১০.‌৪০

আজও খুব চাপের দিন গেল। রাহুল-কঙ্গনা টুইট যুদ্ধ, রাজ্যে করোনা আক্রান্ত, মৃত এবং রোগমুক্তদের সংখ্যা বিজবিজে মগজ নিয়ে অফিস থেকে বেরিয়েছিলাম। গাড়িতে উঠতে গিয়ে দেখলাম গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে।

নিমেষে জীবন পিছিয়ে গেল ২১টা বছর। মনে হল, ছুঁয়ে যাচ্ছে এক অবিশ্রান্ত ফোয়ারার জলবিন্দু। ডানা ঝটপটিয়ে উড়ে যাচ্ছে ঝাঁক ঝাঁক পায়রা।

আর আগাপাশতলা সপসপে ভেজা লাল ফ্রকের এক ডানা-হারানো পরী দু’হাত বাড়িয়ে অচেনা আগন্তুকের চোখে রাখছে তার সমুদ্রনীল চোখ।

লকডাউন ডায়েরি – ১ মে, ২০২০

০১.‌০৫.‌২০২০। শুক্রবার

সকাল ৮.‌২১

নাহ্‌, নাসিরুদ্দিন শাহের স্টোরিটা মিস্‌ করিনি। অ্যাকচুয়্যালি নাসিরুদ্দিন শাহের স্টোরিটা হয়ইনি। কাল গভীর রাতে রাজা একটা লিঙ্ক পাঠাল। খুলে দেখলাম, নাসিরের ছেলে ভিভান টুইট করেছে রাত ৯টা ২১ মিনিটে— ‘অল ওয়েল এভরিওয়ান। বাবা ইজ জাস্ট ফাইন। ওঁর শরীর নিয়ে যাবতীয় গুজব মিথ্যে। উনি ভাল আছেন। প্রেয়িং ফর ইরফানভাই অ্যান্ড চিন্টুজি। মিসিং দেম আ লট। ওঁদের পরিবারের জন্য গভীর সমবেদনা রইল। ইট্‌স আ ডেভাস্টেটিং লস ফর অল অফ আস’।

নাসির নিজেও ফেসবুকে লিখেছেন, ‘যারা আমার স্বাস্থ্যের বিষয়ে খোঁজ নিয়েছে, তাদের ধন্যবাদ। আমি ভাল আছি। বাড়িতেই লকডাউনে আছি। দয়া করে কোনও গুজবে বিশ্বাস করবেন না’। ‌

পড়তে পড়তে কাল রাতে আরেকটা হোয়াট্‌সঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানো কোনও এক হিন্দি চ্যানেলের ব্রেকিং নিউজের একটা স্ক্রিনশট দেখছিলাম। বড় বড় করে লেখা, নাসিরুদ্দিন শাহ গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে। মনে হচ্ছিল, এদের কী অসম্ভব সাহস!‌ জার্নালিজমের বেসিকটাই জানে না। অথচ বুক ফুলিয়ে বাজারে নেমে পড়েছে! ‌এরা এটুকুও জানে না যে, একটা খবর আপলোড করার আগে কমসে কম পাঁচবার চেক করা উচিত। আর এমন একটা সেনসিটিভ সময়ে এত সেনসিটিভ খবর আপলোড করার সময় অন্তত দশবার।

জার্নালিজমের যে ইউনিভার্সিটিতে ১৯৯০ সালে আমার শিক্ষানবিশি শুরু হয়েছিল, সেখানে একটা কথা মন্ত্রের মতো শেখানো হতো— বেটার অমিট দ্যান কমিট। না জানলে লেখার দরকার নেই। জগতে সবকিছু জানা সম্ভবও নয়। কিন্তু ভুল লিখে ক্রেডিবিলিটি নষ্ট কোর না। ওটা গড়তে অনেক সময় লাগে। আমি এখনও সেই ওল্ড স্কুলিংয়ে বিশ্বাস করি। আজীবন করব। এই শিক্ষার মার নেই।

দীর্ঘদিন খবরের কাগজে কাজ করতে করতে মাঝেমাঝেই অডিও ভিস্যুয়ালকে হিংসে হয়েছে। মনে হয়েছে, একটা খবর ভুল হলে ওরা সেটা পাঁচমিনিটের মধ্যে হুইল থেকে তুলে নিতে পারে। কিন্তু কাগজে ছাপা হয়ে গেলে সেটা চিরতরে ডকুমেন্টেড হয়ে গেল!‌ যেমন ধনুক থেকে তির, টিউব থেকে টুথপেস্ট আর মোবাইল থেকে টেক্সট মেসেজ একবার বেরিয়ে গেলে আর ফেরত নেওয়া যায় না। ইদানীং অবশ্য হোয়াট্‌সঅ্যাপ মেসেজে গুবলেট হলে বা ভুল উইন্ডোয় পাঠালে সেটা তৎক্ষণাৎ ডিলিট করা যায়।

আবার পাশাপাশিই জানি এবং মানি যে, অডিও ভিস্যুয়ালের সহকর্মীদের কাজটা অনেক, অনেক বেশি কঠিন। খাটনি অনেক বেশি। ফোনে ফোনে মারার উপায় নেই। স্পটে যেতে হয়। এবং সবচেয়ে বড় কথা— এই দুর্মর প্রতিযোগিতার বাজারে চকিতে সিদ্ধান্ত নিতে হয়। কারণ, কে আগে স্টোরিটা ব্রেক করবে তার উপর চ্যানেলের টিআরপি নির্ভর করে। রিপোর্টারের ভবিষ্যৎও। খবরের কাগজের মতো সারাদিন ধরে জাবর কেটে সন্ধ্যাবেলা দু’ছত্র লিখে দেওয়ার বিলাসিতা সেখানে নেই।

নাসিরের খবরটা যেমন ভুল ছিল, ধরে নিচ্ছি মিঠুন’দার অসুস্থ হয়ে হসপিটালাইজ্‌ড হওয়ার খবরটাও ডাহা গুল।

সকাল ৮.‌৫৪

রোদ্দূর রায়ের মেসেজ, ‘হ্যালো!‌ হাউ আ ইউ ডুইং স্যার?‌’

লিখলাম, অ্যাম গুড। হাউ অ্যাবাউট ইউ?‌

তার আর জবাব আসেনি। বোধহয় মেসেজ পাঠিয়ে গাঁজা–টাজা খেয়ে আবার সমাধিস্থ হয়ে পড়েছে। যেটা ইন্টারেস্টিং, এবার শুধু ‘হ্যালো’ লিখেছে। ‘মোক্‌সাহ্যালো’ নয়। তাহলে কি ওর আর মোক্ষের দরকার নেই?‌ নাকি মোক্ষলাভ হয়ে গিয়েছে অলরেডি?‌

বেলা ১১.‌২০

অমিতাভ বচ্চন তাঁর ব্লগে ঋষি কাপুরকে নিয়ে লিখেছেন। যা লিখেছেন, তার কিছু কিছু ঋষির আত্মজীবনীতে পড়েছিলাম। যা জানতাম না, ঋষি নাকি সেটে শট নিতে দেরি হলে পকেট থেকে তাস বা ব্যাগ থেকে ব্যাগাটেলি বোর্ড বার করে লোকজনকে ডেকে খেলতে বসে যেতেন। এবং সে খেলা স্রেফ টাইমপাস নয়। সিরিয়াস চ্যালেঞ্জের খেলা। সেখানে জেতা–হারাকে যথেষ্ট মূল্য দিতেন তিনি।

একেবারে শেষে অমিতাভ লিখেছেন, ‘অসুখ ধরা পড়া এবং চিকিৎসা চলার সময় একবারও আফশোস করেনি। সবসময় বলত, সি ইউ সুন। জাস্ট আ রুটিন ভিজিট টু দ্য হসপিটাল। আই উইল বি ব্যাক শর্টলি। আমি কখনও ওকে হাসপাতালে দেখতে যাইনি। কারণ, ওর ওই অসামান্য সুন্দর দেবদূতের মতো মুখে যন্ত্রণার ছাপ দেখতে পারতাম না। আমি নিশ্চিত, যাওয়ার সময়েও ও হাসিমুখেই গিয়েছে’।

‘দূরদর্শনইন্ডিয়া’ টুইট করেছে, রামায়ণের রিপিট টেলিকাস্ট সারা পৃথিবীতে ভিউয়ারশিপে রেকর্ড তৈরি করেছে। গত ১৬ এপ্রিল মোট ৭.‌৭ কোটি লোক রামায়ণ দেখেছে। ওরে বাবা!‌

একটু আগে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। দেখলাম চারদিকে প্রচুর রং–বেরঙের প্রজাপতি উড়ছে। কালো চকচকে রাস্তা চিরে দৌড়চ্ছে কাঠবেড়ালি। গাছের পাতায় ফড়িংয়ের ওড়াউড়ি। ওই লাইনগুলো মনে এল—
‘ফড়িংয়ের ডানাতেও
এ জীবন দেয় ডাক।
বেঁচে থাক সব্বাই
হাতে হাত রাখা থাক।’

বেলা ১১.‌৩৬

দিল্লি থেকে স্যমন্তক ফোন করল। রবিবার রবিবার ও একটা ফিচার লিখত। ‘এবেলার সঙ্গে চা’। আইডিয়াটা ছিল বিভিন্ন সেলিব্রিটিদের সঙ্গে চা খেতে খেতে আড্ডা। গতকাল রাতে চুনী গোস্বামীকে নিয়ে লেখাটা ফেসবুকে শেয়ার করেছিল দেবমাল্য। সঙ্গে সুমিত্রর আঁকা চুনী’দার ছবি। স্যমন্তক বলল, ‘ওটা দেখার পর থেকে খুব মন খারাপ লাগছে এবেলার জন্য। কী একটা টিম ছিল আমাদের!‌ সুমিত্রর কথাও খুব মনে পড়ছিল। তাই তোমায় ফোন করলাম।’

বলল, কিছুদিন ধরে জার্মানির মাইন্‌জ ইউনিভার্সিটির জার্নালিজম ডিপার্টমেন্টের মাস্টার্সের ছাত্রছাত্রীদের পড়াচ্ছে। ওদের একটা প্রজেক্টে শুরু হয়েছে। যেখানে ওরা বিভিন্ন দেশের সাংবাদিকদের সঙ্গে ইন্টারঅ্যাক্ট করা শুরু করেছে। স্যমন্তক সেই সাংবাদিকদের একজন। মূলত স্কাইপে ইন্টারঅ্যাকশন। আলোচনার মোদ্দা বিষয়:‌ এই মুহূর্তে অল্টারনেটিভ জার্নালিজম কী এবং এখন সারা পৃথিবী ও ভারতে মেনস্ট্রিম সাংবাদিকতার গ্রহণযোগ্যতার পথে মূল সমস্যাগুলো। কীভাবে সোশ্যাল নেটওয়ার্ক আর মেনস্ট্রিম জার্নালিজমের মধ্যে দ্বন্দ্ব তৈরি হচ্ছে। রিফিউজি ক্রাইসিস। ভারতীয় উপমহাদেশের শরণার্থী ইতিহাস আর ইউরোপে নতুন করে তৈরি হওয়া ক্রাইসিস।

শুনে খুব গর্ব হল প্রাক্তন সহকর্মীর জন্য।

আবার মনে পড়ে গেল সুমিত্রর কথা। ও ছিল ‘এবেলা’র প্রাণ। আমি চারবছর ছুটি নিইনি। ও–ও নেয়নি। প্রথম পাতায় প্রতিদিন কী সমস্ত ইলাস্ট্রেশন করেছে!‌ ২০১৭ সালের ২৬ জানুয়ারি ভোরে ও বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। ততদিনে আমি ‘এবেলা’ ছেড়ে এসেছি। সুমিত্র খুব স্বস্তিতে ছিল না বলেই খবর পেতাম। কিন্তু নিজে থেকে কোনওদিন আমায় কিছু বলেনি। মুখচোরা, অভিমানী শিল্পীরা যেমন হয়। মৃত্যুর খবর পেয়ে গিয়েছিলাম ওর গড়িয়ার বাড়িতে। তখন ওর দেহ ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। ওর স্ত্রী বলেছিল, ‘ও তো আপনার সব কথা শুনত অনিন্দ্যদা। আপনি বললে ও ঠিক ফিরে আসবে। আপনি কেন ওকে একবার ডেকে পাঠাচ্ছেন না?’

কিছু বলতে পারিনি। একরকম পালিয়েই এসেছিলাম। সন্ধ্যায় গিয়েছিলাম বোড়াল শ্মশানে। ততক্ষণে সুমিত্রর দেহ চুল্লিতে ঢুকে গিয়েছে। কিছুক্ষণ একা একাই দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর চলে এলাম।

আর কোনওদিন যাইনি। ওর স্ত্রীয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ করিনি। কী বলতাম?‌ কিন্তু ওই তরুণী সদ্যবিধবার প্রশ্নটা এখনও আমায় তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়। আর মনে হয়, যারা ওর মৃত্যুর জন্য পরোক্ষে দায়ী রইল, তাদের কিছু হল না। তারা সকলে দিব্যি আছে।

তারা দিব্যিই থাকে।

বেলা ১১.‌৫০

ডাক্তার ব্যানার্জিকে ফোন করলাম। স্বার্থের ফোন। উনি আমার বাচ্চাদের ডাক্তার। অ্যান্ড হি হ্যাজ অলওয়েজ বিন মাই গো টু ম্যান। আপাতত বেলঘরিয়ার রেড জোনে বন্দি। ওঁকে আমি ধন্বন্তরি মানি। ইনস্টুর শরীরটা একটু খারাপ হয়েছে হঠাৎ। একটু অ্যাডভাইস দরকার ছিল।

আজ অফিস ছুটি। অতএব পরিপূর্ণ ল্যাদ খাওয়ার দিন। কিন্তু ল্যাদ খেলে চলবে না। ইএমআই–এর চেকটা আজ ফাঁকায় ফাঁকায় যোধপুর পার্কের ব্যাঙ্কের ড্রপ বক্সে ফেলে আসি। অবশ্য এখন তো রোজই ফাঁকা দিন। ফাঁকা রাত।

দুপুর ১২.‌০৮

ওহ্‌, ঋষি কাপুরের ভিডিওটা সত্যিই তাঁর মৃত্যুর আগের রাতে তোলা নয়। এটা কাল রাতেই ফেসবুকের ওয়ালে লিখেছিলেন শান্তনু সেনগুপ্ত। তখনই শুধরে দিয়েছিলাম। আজ দেখছি, নিজের সংস্থার করা সেই খবরকে নিজেই প্রকাশ্যে ভুল বলে ঘোষণা করেছেন ইন্ডিয়া টুডে টিভি–র রাহুল কানওয়াল। বলেছেন, ভিডিওটা গত ফেব্রুয়ারিতে তোলা। আর যিনি গান গাইছেন, তিনি ধীরজ নামে এক ওয়ার্ডবয়। কোনও চিকিৎসক নন।

রাহুলকে আমার এমনিতে খুবই পাকা বলে মনে হয়। অনেকে ওকে নিয়ে খিল্লিও করে। ওর এই টুইটের পরেও করবে। ইন্ডিয়া টুডে চ্যানেলকেও ছ্যা–ছ্যা করবে। কিন্তু নিজের ভুল স্বীকার করতে বুকের পাটা লাগে। বরাবর নিজে এই নীতিতে বিশ্বাস করে এসেছি। কাজ করতে গেলে ভুল হয়। সেটা স্বীকার করার মধ্যে কোনও পরাজয় বা মালিন্য নেই। বরং সৎসাহস আছে। তবে সেটার জন্য বুকের খাঁচা নিয়ে জন্মাতে হয়। যে কলজেতে একটা নীতি এবং ন্যায়নিষ্ঠতা থাকে। সকলের, ইন ফ্যাক্ট বেশিরভাগেরই সে কলজে থাকে না। বা থাকলেও আমার চোখে পড়ে না।

দুপুর ১২.‌৩০

ইরফান খানের স্ত্রী সুতপা শিকদারের লেখা একটা দীর্ঘ পোস্ট ফেসবুকে ঘুরছে। তিনি লিখছেন—

‘একে কীভাবে পারিবারিক বিবৃতি বলি, যখন সারা দুনিয়া এই ঘটনাকে তাদের ব্যক্তিগত ক্ষতি বলে ভাবছে?‌…‌ সকলকে বলতে চাই, এটা ক্ষতি নয়। আসলে এটা লাভ। কারণ, ওর শিক্ষাটা আমরা এখন ফলিত স্তরে প্রয়োগ করতে পারব’।

দীর্ঘ পোস্টে সুতপা আরও লিখছেন, ‘ইরফানকে নিয়ে আমার একটাই ক্ষোভ। ও আমাকে সারা জীবনের মতো স্পয়েল্ট করে দিয়েছে। পারফেকশনের জন্য ওর খুঁতখুঁতুনি আমায় আর এখন সাধারণ কিছুতে সন্তুষ্ট হতে দেয় না।… যেমন চিকিৎসকের রিপোর্ট আমার কাছে ছিল ওর অভিনয়ের চিত্রনাট্যের মতো। যেখানে আমি সামান্যতম ডিটেলও মিস্‌ করতে চাইতাম না। আমাদের জীবনে অবাঞ্ছিত অতিথির আগমনের পর ওর মতোই আমি ক্যাকোফনির মধ্যে হারমনি খোঁজার চেষ্টা করেছি। ওর মতোই জীবনের দোলাচলে ছন্দ খোঁজার চেষ্টা করেছি।

‘গত আড়াই বছর সময়টাকে আমাদের যাত্রাপথে আমি একটা ইন্টারল্যুড হিসেবে দেখি। যে যাত্রার একটা শুরু ছিল। একটা মধ্য ছিল। একটা অন্তও ছিল। ওই ইন্টারল্যুডে ইরফানের ভূমিকা ছিল অর্কেস্ট্রা কন্ডাক্টরের। যা আমাদের ৩৫ বছরের যৌথযাপন এবং সাহচর্যের থেকে আলাদা। আওয়ার্‌স ওয়াজ নট আ ম্যারেজ। ইট ওয়াজ আ ইউনিয়ন।

‘আমাদের ছোট পরিবারকে বরাবর একটা নৌকোর মতো দেখেছি। যেখানে বাবিল আর আয়ান বৈঠা নিয়ে দাঁড় বাইছে আর ইরফান ওদের গাউড করছে, ‘এদিকে যাও। ওদিকে মোড়ো।’ কিন্তু জীবনটা তো আর সিনেমা নয়। সেখানে কোনও রিটেক নেই। আশা করি, ভবিষ্যতেও ইরফানের পরামর্শ অনুযায়ীই বাবিল–আয়ান যাবতীয় ঝড়ঝাপ্টা সামলে নৌকোটা এগিয়ে নিয়ে যাবে।

‘আমি ওদের বলেছিলাম, ওরা কি ওদের বাবার দেওয়া ইম্পর্ট্যান্ট শিক্ষা এককথায় বলতে পারবে?‌

বাবিল বলল, ‘লার্ন টু সারেন্ডার টু দ্য ডান্স অফ আনসার্টেনটি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইওর ফেথ ইন দ্য ইউনিভার্স।’

আয়ান বলল, ‘লার্ন টু কন্ট্রোল ইওর মাইন্ড অ্যান্ড টু নট লেট ইট কন্ট্রোল ইউ।’

৩৫ বছরের সঙ্গী চলে যাওয়ার ৪৮ ঘন্টার মধ্যে এই কমপোজার শেখার মতো। শোক আত্মস্থ হতে সাধারণত সময় নেয়। প্রার্থনা করব, জীবনের বাকি দিনগুলোতেও সুতপা এই শক্তি অটুট রাখতে পারবেন।

দুপুর ২.‌৩০

যোধপুর পার্কের ফুটপাথে ব্যাঙ্কের ড্রপবক্সে চেক ফেলে কালিকাপুরের পেট্রল পাম্পে তেল নিতে গিয়েছিলাম। খাঁ খাঁ করছে গোটা এলাকা। পাম্পের ক’জন কর্মী বসে নিজেদের মধ্যে গজল্লা করছিলেন। এই পাম্পটা সারা রাত খোলা থাকত। এখনও কি তা–ই থাকে?‌ মাথায় টুপি, থুতনিতে হাল্কা নূরের এক বয়স্ক কর্মী বললেন, ‘হ্যাঁ থাকে। তবে গাড়ি–টাড়ি আসে না। দিনেরবেলাতেও এখন মাত্র সাত–আটটা গাড়ি আসে।’
— আগে কত আসত?
‌‘প্রচুর! ‌প্রচুর! এই একটা মেশিন থেকে দিনে তিন–চার লাখ টাকার সেল হতো। এখন সারা দিনে মেরেকেটে ১০ হাজার টাকার তেল বিক্রি হয়। আচ্ছা, এই লকডাউন কতদিন চলবে?‌’
— অনেকদিন। অন্তত মে মাসটা তো বটেই। তেমনই মনে হচ্ছে এখন।

কর্মীরাই বললেন গাড়ির চাকার হাওয়া চেক করিয়ে নিতে। মনে হল, তাঁরা চাইছেন আরও একটুক্ষণ থাকি। আরও একটুক্ষণ প্রাণের সাড়া থাকুক নিঝুম পরিপার্শ্বে। কিছু বকম বকম হোক।

ভাগ্যিস চেয়েছিলেন। হাওয়া পরীক্ষা করাতে গিয়ে ধরা পড়ল, পিছনের বাঁদিকের টায়ারে একটা লিক আছে। মুস্তাক বলে এক তরুণ অভিজ্ঞ চোখে ধরলেন। তিনমিনিটে সারিয়েও দিলেন। রাখে মুস্তাক, মারে কে! দুপুর থেকে যে দুর্যোগ শুরু হয়েছে, তা আরও অন্তত দু’দিন চলবে বলেই খবর। রাস্তায় গাড়ি বসে গেলে কী করতাম! ফোন নম্বর নিয়ে রাখলাম ‌মুস্তাকের। লকডাউনের এই দুনিয়ায় এসব খাপ খুলে রাখা খুব জরুরি। ‌

সন্ধ্যা ৬.‌৪৬

সারা দেশে লকডাউন সেই বাড়ল। আপাতত ১৭ মে পর্যন্ত। আপাতত। কারণ, ব্যক্তিগত ধারনা ওটা অন্তত মে মাসের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হবে। সল্টলেকের বাড়িতে যেদিন থেকে থাকতে শুরু করলাম, সেদিনই মনে হয়েছিল, এটা মে মাস শেষ পর্যন্ত টানবে।

অর্থাৎ ১৭ মে পর্যন্ত যাত্রীবাহী বিমান, যাত্রীবাহী রেল, মেট্র, আন্তঃরাজ্য সড়ক পরিবহণ বন্ধ। বন্ধ স্কুল কলেজ সহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান। এবং এই নির্দেশ রেড, অরেঞ্জ, গ্রিন সমস্ত জোনেই প্রযোজ্য। গ্রিন ও অরেঞ্জ জোনে শর্তসাপেক্ষে মদের দোকান খোলা যাবে বলে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্র।এই দুই জোনে নিশ্চয়ই খুশির হাওয়া।তবে, সমস্যা হল নির্দেশে বলা হয়েছে একটি দোকানে একই সময়ে পাঁচজনের বেশি থাকা যাবে না। আর পরস্পরের মধ্যে ছ’ফুট দূরত্ব রাখতে হবে। কিন্তু পিপাসুদের কি এত নিয়মের নিগড়ে বেঁধে রাখা যাবে ? নিশ্চয়ই এতদিনে অনেকের শরীরে অ্যালকোহলের মাত্রা এত কমেছে যে, প্রায় হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে ড্রিপ দেওয়ার মতো অবস্থা ! তাঁদের কি এত ধৈর্য সইবে?

সন্ধ্যা ৭.‌২৪

টিং করে একটা হোয়াট্‌সঅ্যাপ নোটিফিকেশন ঢুকল। খুলে দেখলাম রূপঙ্কর একটা গান পাঠিয়েছেন। ‘বিষন্ন গোলাপ’। উনি এবং উজ্জয়িনী গেয়েছেন। ভিডিও–টা সাদা–কালোয় শ্যুট করা। গানটা শুনে ভাল লাগল। তবে ভিডিও–তে রূপঙ্কর–উজ্জয়িনীর মুখ অর্ধেক অর্ধেক জুড়ে একটা কান্ড করা হয়েছে। ওটা আমার খুব একটা পোষাল না।

সন্ধ্যা ৭.‌৫১

ফেসবুকে দেখছি সকন্যা ন্যাড়া হয়েছে সহকর্মী নজরুল। ওর স্ত্রী–র হাতযশ। এটা কিন্তু জাস্ট ফাটিয়ে দিয়েছে!‌ আমাকেও এই দুঃসাহসিক কাজটা করতে হতে পারে। কিন্তু আমাকে কি ওর মতো হ্যান্ডসাম লাগবে? ‌দ্বিতীয়ত, সেলুনের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ে যে আতঙ্ক ছড়িয়েছে, তাতে কি ভবিষ্যতে চারদিকে প্রচুর ন্যাড়ামুন্ডি দেখা যাবে?‌

রাত ৮.‌০১

সন্তোষ’দা ফোন করলেন। সন্তোষ সাহা। নরেন্দ্রপুরের শিক্ষক। ওঁর সঙ্গে আমার খানিকটা অনিয়মিত হলেও যোগাযোগ আছে। ওঁর কন্যার বিবাহেও গিয়েছিলাম। সন্তোষ’দার ফোনে স্মৃতির দরজা–জানালাগুলো ঝপ ঝপ করে খুলে গেল। প্রেয়ারহলে প্রেয়ার চাদর মুখে দিয়ে হাসার জন্য নরেন্দ্রপুরের ছ’বছরের জীবনে মাত্র একবার বেত খেয়েছিলাম। তা–ও সন্তোষ’দার হাতেই।

উনি আমার ছোটবেলার হিরো। ফ্যান্টাস্টিক ফুটবল আর ভলি খেলতেন। উনি নেটে খেলতেন আর আমি মিড্‌লম্যান। নেটে বল তুলতাম আর সন্তোষ’দা ফাটিয়ে স্ম্যাশ করতেন। তেমনই স্মার্ট ছিলেন। ছিপছিপে চেহারা। মুর্শিদাবাদের মানুষ। জুনিয়র সেকশনের হস্টেলে থাকতেন ওয়ার্ডেন হিসেবে। সন্তোষ’দাকে ভালবাসতাম। কিন্তু ভয়ও পেতাম। ডানহাতে মেটাল স্ট্র্যাপের ঘড়ি পরতেন। ওই হাতেই মারতেন। মারার আগে ঘড়িটা খুলে নিতেন। পাছে ছাত্রের গা–হাত–পা কেটে যায়। সন্তোষ’দা কাউকে ‘অ্যাই এদিকে আয়’ বলে ডেকে ঘড়ি খুলছেন দেখলে প্রমাদ গুনতাম।

কিন্তু ভিতরে ভিতরে একটা তীব্র হিরো ওয়ারশিপ ছিল। আগে শুধু গোঁফ ছিল। পরে দাড়ি রাখতে শুরু করে আরও হ্যান্ডসাম হয়ে গেলেন। একদিকের ভুরু উপরে তুলে প্রশ্ন করতেন। যেটা পরবর্তীকালে শ্রীদেবী আর মাধুরী দীক্ষিত ছাড়া কাউকে করতে দেখিনি।

এখন সন্তোষ’দা ৭০। স্ত্রীয়ের হাঁটু অপারেশন হয়েছে বলে নিজেই বাড়ির সব কাজ করছেন। তার মধ্যেও ফোন করে পুরোন ছাত্রের খোঁজ নিচ্ছেন। বললেন, ‘তুই আমার মনের ভিতরে থাকিস। তোকে আমি কোনওদিন ভুলব না।’ চোখে জল এল। কোনও প্রয়োজনে ফোন করেননি। অথচ আমার তো এই সময়টায় ওঁর কথা মনে পড়েনি! ‌এতদিন কেটে গেল!‌ ঘোর লজ্জা হল।

রাত ১০.‌১০

আজ সারাদিন ইংলিশ ওয়েদার। হলদে ফুলের চাদরে রাস্তাঘাট বিদেশের মতো লাগছে। ঠাণ্ডা এক মাতলা হাওয়া বইছে।এবার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হল—
‘বেঁচে থাক সব্বাই
হাতে হাত রাখা থাক।’